রবিবার, ২২ মে ২০২২, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

শিক্ষা ক্যাডারের নবনির্বাচিত ঝুলন্ত কমিটি এবং আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা

  • স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
  • ২০২২-০৪-১১ ২০:৩৫:০৮
image

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে গত ২০ মার্চ ২০২২ । বেসরকারিভাবে ফলাফলও প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা মনে করছেন এবারের নির্বাচনে সমিতির একটি ঝুলন্ত কমিটি হয়েছে। এক প্যানেলের ‘মাথা’ আরেক প্যানেলের ‘গলা ও বুক’ এবং অন্য আরেক প্যানেলের ‘পা’ নিয়ে নির্বাচিত এই কমিটি ক্যাডারের উন্নয়নে কতদূর কাজ করতে পারে তা-ই এখন দেখার বিষয়। সভাপতিসহ ৩৪টি পদ পেয়ে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন শাহেদ-রেহেনা প্যানেল তথা ‘ঘ’ প্যানেলের নেতৃবৃন্দ। ‘চ’ প্যানেল থেকে মহাসচিব এবং কোষাধ্যক্ষ প্রার্থী জিতলেও অন্যান্য পদ পেয়েছে খুবই কম আর ‘খ’ প্যানেল অগুরুত্বপূর্ণ কিছু পদ নিয়ে নির্বাচনী রেসে টিকে আছে। সমিতির নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে শিক্ষা ক্যাডারের ফেসবুক গ্রুপগুলোতে নানান আলোচনা সমালোচনা চলছে এবং এখনও চলমান আছে। কেউ কেউ বলছেন এবারের সমিতির নির্বাচনটি হয়েছে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলায় পাতানো গেমের মতো। ভোট পাতানো খেলায় ‘ক’ প্যানেলের রিজার্ভ ভোট অন্য প্যানেলকে দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুইটি পদ ‘বিতর্কিত একটি প্যানেলের’ অনুকূলে চলে যাওয়া পাতানো গেমেরই ইঙ্গিত বহন করে। আবার বিতর্কিত ঐ প্যানেলের ‘পৃষ্ঠপোষকতাকারীদের’ সাথে সরকার সমর্থিত বলে কথিত আরেকটি প্যানেলের ‘ঐক্য জোট’ করা আরও ভয়াবহ পাতানো গেমেরই ইঙ্গিত দেয়। তারপরও শাহেদ-রেহেনা-মাসুদা প্যানেল সবগুলো প্যানেলের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে সভাপতিসহ ৩৪টি পদ লাভ করেছে- এটা শিক্ষা ক্যাডারের জন্য খুবই স্বস্তির বলে মনে করছে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাবৃন্দ।   

নির্বাচন শেষ হয়েছে। কিন্তু সমিতির গঠনতন্ত্রে দায়িত্ব হস্তান্তরের কোনো প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ নেই। ফলে নতুন কমিটির দায়িত্ব হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। সমিতির গঠনতন্ত্র পরিবর্তন, ভোটদানের পদ্ধতি উন্নতকরণ, সমিতির নাম পরিবর্তন করা ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা নির্বাচনের সময় থেকেই চলছিল। নির্বাচনের পরে দায়িত্ব হস্তান্তর এবং পরবর্তী করণীয় নিয়ে গ্রুপগুলোতে আলোচনা চলছে। গত ২০ মার্চ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর প্রায় ২০ দিন গত হতে চললো সমিতির কার্যক্রম এখনও দৃশ্যমান নয়। এরই মধ্যে শিক্ষা ক্যাডারে বেশ কিছু ইস্যুর সূত্রপাত হয়েছে যা নিয়ে শিক্ষা ক্যাডারে অস্থিরতা বিরাজ করছে। 

আরও পড়ুন : বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির বহুল কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন: প্রাপ্তি একটি ঝুলন্ত কমিটি

গত ৩০ মার্চ বুধবার  শরীয়তপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারি কলেজের বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা বিএম সোহেলকে লাঞ্ছিত করে ছাত্রলীগের কলেজ শাখার সভাপতি সোহাগ ব্যাপারী ও তার কিছু অনুসারী। এ নিয়ে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির নির্বাচিত কমিটির সামনে এটি একটি চ্যালেঞ্জ ছিল। শোনা যায় কলেজ শাখা ছাত্রলীগের উক্ত সভাপতি স্থানীয় একজন এমপির আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় প্রথমে থানা মামলা নেয়নি। পরে সমিতির নির্বাচিত স্থানীয় নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে থানা মামলা নিতে বাধ্য হয়। গত ২ এপ্রিল শনিবার কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. হারুন-অর-রশিদ বাদী হয়ে  সরকারি কলেজ (শরীয়তপুর) শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সোহাগ বেপারী ও সাধারণ সম্পাদক রাসেল জমাদ্দারের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আক্তার হোসেন বলেন, ওই ঘটনায় সোহাগ ও রাসেলের নামসহ ২০ থেকে ২৫ জন অজ্ঞাত আসামি করে একটি মামলা করেছেন কলেজের অধ্যক্ষ। আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় যখন চারিদিকে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভের বহি:প্রকাশ ঘটছে তখনই একটি নামসর্বস্ব নিউজপোর্টাল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঘটনাটি নিয়ে নেতিবাচক রিপোর্ট করেছে। উক্ত কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যালের সাথে অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতার সম্পর্ক এবং সেই ভাইস প্রিন্সিপ্যালের সাথে মাউশির একজন পরিচালকের সখ্যতার কাল্পনিক গল্প ফেঁদে ঘটনাটিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করছে। এ নিয়ে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের একজন তরুণ কর্মকর্তা ক্ষোভের সাথে বলেন, বিএম সোহেলের ঘটনায় ষোলো হাজার ক্যাডার কর্মকর্তা যখন একতাবদ্ধ হয়েছে ঠিক তখনই এরূপ হলুদ সাংবাদিকতা ক্যাডার সদস্যদের ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। উক্ত পত্রিকাটি সবসময় শিক্ষা ক্যাডার বিরোধী নিউজ করে অন্য কারও এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। এই পত্রিকাটির বিভ্রান্তিকর নিউজ থেকে সাবধান থাকার জন্য আহ্বান জানান তিনি।

শরিয়তপুর সরকারি কলেজের ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকসহ অজ্ঞাত ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়েছে ২ এপ্রিল। আজ প্রায় ৮ দিন হতে চললো একজন আসামীও এখন পর্যন্ত ধরা পড়েনি। শিক্ষা ক্যাডারের একজন সদস্য ক্ষোভের সাথে বললেন, এই ঘটনা যদি প্রশাসন ক্যাডার, পুলিশ ক্যাডার কিংবা অন্য কোনো ক্যাডারের সাথে ঘটতো তাহলে এতক্ষণে আসামীদের জেলহাজতে দেখতে পেতাম। কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং সমিতির নেতৃবৃন্দ সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পরও প্রথমে মামলা নিতে গড়িমসি এবং পরবর্তীতে আসামী গ্রেপ্তারে অনীহা আমাদের আহত করছে। আমরা চাই আসামীদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক এবং ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দোষী ব্যাক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হোক। নতুবা শিক্ষক লাঞ্ছনার এ ঘটনা শিক্ষা সেক্টরে ভয়াবহ অশনিসংকেত হয়ে দেখা দেবে।

শিক্ষা ক্যাডারের এই অস্থিরতার মধ্যেও একটি স্বস্তির সংবাদ বয়ে এনেছে মনতাজের মামলা। এই মামলটির উৎপত্তি হয়েছিল ২০১৫ সালে। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ২৪ ব্যাচের একজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে ২৮ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের একজন জুনিয়র কর্মকর্তা কর্তৃক লাঞ্ছিত করার ঘটনা থেকে এই মামলার উৎপত্তি। সেই সময়ে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির দায়িত্বে যারা ছিলেন তাদের উদ্যোগে পিরোজপুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট এবং হাইকোর্টে দুটি মামলা হলেও কোনো কোর্টেই প্রতিকার পাওয়া সম্ভব হয়নি। মামলার বাদী মনতাজের অনীহা, প্রভাবশালীদের চাপ ইত্যাদির কারণে মামলাটি প্রায় হারিয়ে যেতেই বসেছিল। পিরোজপুর আদালতে মামলাটি চলমান থাকলেও হাইকোর্টে মামলাটি খারিজ করে দেওয়া হয় অপর্যাপ্ত তথ্যের কারণে। ২০১৬ সালে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির তৎকালীন মহাসচিব, দপ্তর সচিব এবং আইন ও সহআইন সচিবের তৎপরতায় মামলটি আবার পুনরুজ্জীবিত হয় সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগে। কিন্তু মামলার শুনানির কিছু পূর্বে মূল আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক মারা গেলে আইনজীবীর অনুপস্থিতির কারণে ‘ডিসমিস ফর ডিফল্ট’ হিসাবে পুনরায় মামলাটি খারিজ করে দেওয়া হয়। তারপরও হাল ছেড়ে না দিয়ে কতিপয় নিবেদিতপ্রাণ ক্যাডার কর্মকর্তার প্রচেষ্টায় মামলাটি রিস্টোরেশন বা পুনরুজ্জীবিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৭ মার্চ আসে ঐতিহাসিক রায়। প্রধান বিচারপতি জনাব হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ বিষয়টি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ শুনানি করেন। শুনানি শেষে প্রদত্ত রায়ে পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়া সরকারি কলেজে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা জনাব মনতাজ উদ্দিনকে অমানবিক নির্যাতনের ঘটনায় অভিযুক্ত জনাব আশরাফুলের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত রিপোর্টে প্রাথমিক সত্যতা থাকায় বিজ্ঞ আদালত দোষীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ( Departmental Proceedings) গ্রহণের প্রক্রিয়া গ্রহণের জন্য সর্বসম্মতভাবে নির্দেশ দিয়েছেন।

শিক্ষা ক্যাডারের মান-মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার এ মামলায় অনেকের মনে স্বস্তি আসলেও পরবর্তী প্রক্রিয়া কি হবে এবং কীভাবে হবে তা নিয়ে অনেকেই অন্ধকারে আছেন। সর্বোচ্চ আদালত অভিযুক্তের (জনাব আশরাফুল আলম) বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিলেও এ নির্দেশ কিভাবে পালিত হবে তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। সমিতি ঐক্যবদ্ধভাবে এ বিষয়টি পরিচর্যা না করলে আদালতের আদেশ পর্যন্তই কার্যক্রম থেমে থাকবে বলে অনেক ক্যাডার কর্মকর্তা মনে করেন। শিক্ষা ক্যাডার কিভাবে অন্য একটি ক্যাডার কর্তৃক অপমানিত এবং লাঞ্ছিত হতে পারে তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ এই ঘটনাটি। একটি বিশেষ ক্যাডার শিক্ষা ক্যাডারকে কি চোখে দেখে তারও জ্বলন্ত উদাহরণ এই ঘটনাটি। তাই ‘মনতাজের মামলাটি’ই হতে পারে শিক্ষা ক্যাডারের ‘মাজদার হোসেন’ মামলা। এক মাজদার হোসেন মামলায় জুডিশিয়াল ক্যাডার অন্যান্য ক্যাডার থেকে বেরিয়ে এক স্বতন্ত্র মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল।

আরও পড়ুন : শিক্ষা ক্যাডারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র: নেপথ্যে কারা কলকাঠি নাড়ছেন

মনতাজের মামলায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালত থেকে বিচারবিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশদানের পরিপ্রেক্ষিতে এক প্রতিক্রিয়ায় বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সাবেক দপ্তরসচিব সৈয়দ মইনুল হাসান বলেন, ‘আমরা ২০১৬ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নতুন করে মামলাটি দায়ের করি। কিন্তু মামলার শুনানির কিছু পূর্বে মূল আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিকুল হক মারা গেলে আইনজীবীর অনুপস্থিতির কারণে ডিসমিস ফর ডিফল্ট হিসাবে পুনরায় মামলাটি খারিজ করে দেওয়া হয়। এ অবস্থায় আমরা হাল ছেড়ে না দিয়ে আমাদের নিয়মিত আইনজীবীর মাধ্যমে আপিল বিভাগে মামলাটি রিস্টোরেশন বা পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়ে অবশেষে সফল হই। আমরা বিশ্বাস করি, এটি একটি ঐতিহাসিক রায়। এ রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডারের মর্যাদা অধিকতর সমুন্নত হবে।’

এবারের বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির নির্বাচনে ‘ঘ’ প্যানেল তথা শাহেদ-রেহেনা প্যানেল থেকে যুগ্ম-মহাসচিব (ঢাকা মহানগর, পুরুষ) পদে প্রার্থী ছিলেন সৈয়দ মইনুল হাসান। কিন্তু ভোটার নম্বর ভুলের কারণে প্রার্থীতা বাতিল হয়ে যায়। ফলে তিনি নির্বাচন করতে পারেন নি। তারপরও বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের জন্য নিবেদিতপ্রাণ এই কর্মকর্তা বসে নেই । ক্যাডারের স্বার্থে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন নিরলস। প্রচারবিমুখ এই কর্মকর্তা এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে ‘মামলা, সহযোদ্ধাগণ ও ক্যাডারের অব্যাহত বিজয়’ শিরোনামে নিজেদের অর্জনের কথা তুলে ধরেছেন। ২০১১ সালে ১৭’শ বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ফোরামের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি শিক্ষা ক্যাডারের মর্যাদা সমুন্নত রাখার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। ‘যেখানে আলোচনায় লক্ষ্য অর্জিত হবেনা, সেখানে মামলাই হবে মোক্ষম অস্ত্র’ এই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে তিনি শিক্ষা ক্যাডারের যুগান্তকারী কিছু মামলার সূচনা করেন। এর মধ্যে ১৮ মহিলা কলেজ মামলা, ২০১৭ সালে আত্তীকৃত বিরোধী মামলা (যার অর্জন ২০১৮ বিধি), ২০০০ বিধিতে সমতা চেয়ে আত্তীকৃতদের রিট মামলা, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর মামলা (১৪ জন ক্যাডার কর্মকর্তাকে মাদ্রাসা অধিদপ্তর থেকে প্রত্যাহারের আদেশ বাতিল) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ২০১৬ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১৩টি মামলায় তিনি সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে লড়াই করেছেন যার মধ্যে ৭টিতে পূর্ণ বা আংশিক বিজয় এসেছে। বাকি মামলাগুলোর ফলাফলও শিক্ষা ক্যাডারের পক্ষে আসবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদী।

১৭ এবং ১৮ ব্যাচকে সংগঠিত করে সমিতির তৎকালীন মহাসচিব প্রফেসর শাহেদুল খবির চৌধুরীর নেতৃত্বে এই যুগান্তকারী লড়াইয়ে তিনি পেয়েছেন একঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ ক্যাডার কর্মকর্তাকে। সমিতির মাধ্যম ব্যতিত এই লড়াই সম্ভবপর হতো না। ২০২২ সালের নির্বাচনে তিনি লড়াই করতে না পারলেও সমিতির মর্যাদা রক্ষায় তিনি লড়াই করে চলেছেন। এ বিষয়ে শিক্ষা ক্যাডারের একজন তরুণ কর্মকর্তা বলেন, ‘সৈয়দ মৈইনুল হাসান স্যার শিক্ষা ক্যাডার অন্তঃপ্রাণ। তিনি শিক্ষা ক্যাডারের থিংক ট্যাংক। এবারের সমিতির নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হতে না পারলেও আগামী নির্বাচনে তিনি অবশ্যই শিক্ষা ক্যাডারের শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব দেবেন। শাহেদ স্যার এবং মইনুল স্যারের নেতৃত্বে শিক্ষা ক্যাডার আগামী প্রজন্মের কাছে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।’

উল্লেখ্য, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের নানাবিধ সমস্যা। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ ক্যাডার শিক্ষা ক্যাডার। এই ক্যাডারের সদস্য বর্তমানে প্রায় ১৬০০০। বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (বিপিএসসি) এর মাধ্যমে অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসের সাথে একই যোগ্যতার কষ্টিপাথরে যাচাইকৃত হয়ে তবেই এ ক্যাডারে আসতে হয়। সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সম্মিলন এই ক্যাডারে। কারণ অন্যান্য ক্যাডারে স্নাতকধারীও বিসিএস পরীক্ষা দেবার সুযোগ পায় এবং ক্ষেত্রবিশেষে নির্বাচিতও হয়। কিন্তু বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে মাস্টার্স পাস ব্যাতীত আবেদন করারই সুযোগ নেই। শিক্ষা সেক্টর একটি বৃহৎ সেক্টর। প্রাইমারি থেকে টারশিয়ারি পর্যন্ত শিক্ষার সবকিছুই এই ক্যাডারের আওতায় থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কথাই ধরা যাক। এই মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বরত যারা আছেন তারা কেউই শিক্ষা ক্যাডারের না। সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম-সচিব, উপসচিব, সহকারী সচিব সব পদেই একটি বিশেষ ক্যাডারের লোকজন। মাঠপর্যায়ে তারা এসি ল্যান্ড, ইউএনও, ডিসির দায়িত্ব পালন করে সরাসরি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। অথবা অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করে দু’এক বছরের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পদায়িত হন। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের অভিমত হচ্ছে যারা মাঠপর্যায় থেকে শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত থেকে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হন তাদের মধ্যে কি একজনও নেই যারা সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন? কেন এই বৈষম্য? 

আরও পড়ুন : টিএমইডি সচিবের বক্তব্য জাতির পিতার উন্নয়ন দর্শনের পরিপন্থী : শাহেদুল খবির চৌধুরী

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে শিক্ষা ক্যাডারের উচ্চস্তরের পদ ৪র্থ গ্রেডেই আটকে আছে। অন্য কোনো ক্যাডারে ৫ম গ্রেড থেকে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হয়ে ৩য় গ্রেডে যাওয়ার বিধান থাকলেও শিক্ষা ক্যাডারে ৪র্থ গ্রেড পর্যন্ত যাওয়ার বিধান বিদ্যমান। অনেক শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা মনে করেন এ ক্যাডারকে ইচ্ছা করেই চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত আটকে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ এ ক্যাডার থেকে অধিকাংশ সদস্যকেই চতুর্থ গ্রেড থেকেই বিদায় নিতে হয়। সম্প্রতি ৯৫টি অধ্যক্ষ পদকে তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত করার একটি প্রস্তাব বাস্তবায়নের পথে আছে। এখনও ৩টি দ্বিতীয় গ্রেডের পদ বাস্তবায়নাধীন। কবে বাস্তবায়ন হবে জানা নেই। শিক্ষা ক্যাডারের মহাপরিচালকের পদটি ১ নং গ্রেডের হলেও এই পদে যাওয়ার সোপান এখনও তৈরি হয়নি। ২য় গ্রেড না থাকায় পদোন্নতি পেয়ে কেউ ১ নং গ্রেডে যেতে পারেন না শিক্ষা ক্যাডার থেকে। ফলে ৪র্থ গ্রেডের কর্মকর্তাই চলতি দায়িত্ব হিসেবে মহাপরিচালকের পদ পান। ফলে একটি হ-য-ব-র-ল অবস্থা বিরাজ করছে শিক্ষা ক্যাডারে। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের দাবি সকল প্রফেসর পদ তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত করা এবং আনুপাতিক হারে দ্বিতীয় গ্রেড প্রদান করা। এছাড়াও সিনিয়র সচিব এবং সচিব পদেও শিক্ষা ক্যাডার থেকে নিয়োগ প্রদানের দাবি ক্রমশঃ জোরালো হচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত কর্মজীবন পরিকল্পনায় এ বিষয়টি প্রস্তাব আকারে প্রেরণ করা হয়েছে বলে বিশ্বস্তসূত্রে জানা গেছে। 

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের একমাত্র প্রাণের সংগঠন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি। ক্যাডারের মঙ্গলের জন্য যা কিছু অর্জন সমিতির মাধ্যমেই করতে হবে বলে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের বিশ্বাস। তাই এবারের ঝুলন্ত সমিতি হলেও সভাপতি হিসেবে যিনি নির্বাচিত হয়েছেন, প্রফেসর শাহেদুল খবির চৌধুরী, তার উপর ক্যাডার কর্মকর্তাদের পূর্ণ আস্থা বিদ্যমান। সমিতির পরীক্ষিত নেতৃবৃন্দকে নিয়ে তিনি এগিয়ে যাবেন এ আস্থা তিনি নির্বাচিত হওয়ার পরপরই দিতে পেরেছেন। সমিতির সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পরপরই শিক্ষা বিষয়ক সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, ‘সচিবসহ শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে শিক্ষকদেরই রাখা উচিত। এটি না থাকায় শিক্ষকতার পাশাপাশি সমগ্র জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

শাহেদুল খবির চৌধুরী আরও বলেন, ‘শিক্ষা ক্যাডারে সাড়ে ১২ হাজার পদ সৃষ্টির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। উচ্চশিক্ষার স্তরে মানসম্মত শিক্ষার বিস্তারে এই পদগুলো অনুমোদন দেয়া খুবই জরুরি। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এগুলো বিলম্বিত হচ্ছে। এতে শিক্ষা সেক্টর চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, শিক্ষকরা থাকবেন শিক্ষা প্রশাসনে। এটা না হলে শিক্ষকতা পেশা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না পাওয়াতেও শিক্ষকতার উৎকর্ষ সাধন সেভাবে হচ্ছে না। এর জন্যও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দায়ী।’

শিক্ষা ক্যাডারদের ব্যাচভিত্তিক প্রমোশন, প্রয়োজনীয় নতুন পদ সৃষ্টিসহ ক্যাডারদের পেশাগত উৎকর্ষ সাধনে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি অগ্রণী ভূমিকা রাখবে। শিক্ষা ক্যাডারের সব ব্যাচের শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

আরও পড়ুন : মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা সচিবের বক্তব্যের জোরালো প্রতিবাদ শিক্ষা ক্যাডার ও সমিতির নেতৃবৃন্দের

শিক্ষা ক্যাডারের পদসোপান তৈরি, নতুন পদ সৃষ্টি, শিক্ষা ক্যাডারের চাকুরি নন ভ্যাকেশন করা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সমস্যা, শিক্ষা ক্যাডারের পদদখল ইত্যাদি নানান সমস্যায় জর্জরিত এই ক্যাডারের উন্নয়নে বর্তমান সমিতির নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে প্রফেসর মো. শাহেদুল খবির চৌধুরীর উপর অনেক দায়িত্ব। এছাড়াও নির্বাচনে ‘ঘ’ প্যানেল থেকে প্রকাশিত ইশতেহারে প্রায় ২৮টি অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। এই অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি শক্তিশালী সমিতি। অনেকের অভিমত ‘শাহেদ-রেহেনা-মাসুদা’ প্যানেল পূর্ণরূপে বিজয়ী হলে শিক্ষা ক্যাডারের জন্য ইতিহাস রচিত হতো।  এবারের নির্বাচিত ‘ঝুলন্ত কমিটি’ কতদূর এগুতে পারবে তা-ই এখন দেখার বিষয়। তবুও এবারের নির্বাচন থেকে ভুলগুলো শুধরে ক্যাডারের জন্য নিবেদিতপ্রাণ কর্মকর্তাদের নিয়ে নির্বাচিত সভাপতি প্রফেসর শাহেদুল খবির চৌধুরী এগিয়ে যাবেন দৃঢ়চিত্তে- এটাই ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা। 

শিক্ষাক্যাডারের নিয়মিত সংবাদ পেতে শিক্ষাপত্রিকার ফেজবুক পেজে লাইক করুন


এ জাতীয় আরো খবর