রবিবার, ২২ মে ২০২২, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির বহুল কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন: প্রাপ্তি একটি ঝুলন্ত কমিটি

  • স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
  • ২০২২-০৩-৩০ ০১:৫৭:৪২
image

গত ২০ মার্চ ২০২২ খ্রি. বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির বহুল কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সারা দেশের ২১৯টি কেন্দ্রে একযোগে সকাল ১০টা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। ভোট গ্রহণের দিনই নির্বাচনের ফলাফল কিছুটা আঁচ করা যায়। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে সভাপতি, মহাসচিব এবং কোষাধ্যক্ষ পদের ভোটের হিসাব আসতে থাকে। একসময় স্পষ্ট হয়ে যায় সভাপতি, মহাসচিব এবং কোষাধ্যক্ষ পদসহ কোনো প্যানেলই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না।

নির্বাচনে ‘ঘ’ প্যানেলের সভাপতি পদপ্রার্থী প্রফেসর শাহেদুল খবির চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন প্যানেল সভাপতিসহ বেশ ক’টি গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়ে সমিতিতে বেশ শক্ত অবস্থানে আছে। ’চ’ প্যানেল মহাসচিব এবং কোষাধ্যক্ষসহ গুটিকয়েক পদ পায়। আর ‘খ’ প্যানেল পায় বাকি পদ। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সর্বমোট পদ ১২৩টি। এর মধ্যে ৬১টি কেন্দ্রীয় এবং বাকি ৬২টি অঞ্চলভিত্তিক নির্বাহী সদস্য পদ। হিসাবের দিক দিয়ে ’ঘ’ প্যানেল সভাপতিসহ ১৬টি কেন্দ্রীয় এবং ১৮টি নির্বাহী সদস্য পদসহ সর্বমোট ৩৪টি পদ পেয়ে সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থানে আছে। তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি পদ পেয়েছে ‘খ’ প্যানেল। তাদের প্রাপ্ত পদের সংখ্যা কেন্দ্রীয় ৩১টি এবং নির্বাহী সদস্য ২৮ টি সহ সর্বমোট ৫৯টি। অপরপক্ষে ‘চ’ প্যানেল নির্বাহী সদস্যসহ পেয়েছে সর্বমোট ২৩টি পদ। এর মধ্যে সেক্রেটারি এবং ট্রেজারার পদ দু'টো গুরুত্বপূর্ণ। স্বতন্ত্র পেয়েছে ৭টি নির্বাহী সদস্য পদ যেগুলো ‘ঘ’ প্যানেলেরই পক্ষে আছে।

এবারের নির্বাচনে মোট ৭টি প্যানেল অংশগ্রহণ করে। ‘ঘ’ প্যানেল থেকে প্রফেসর মো. শাহেদুল খবির চৌধুরী ৪৮৫০ ভোট পেয়ে চুড়ান্তভাবে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ‘খ’ প্যানেলের প্রফেসর অলিউল্লাহ মো: আজমতগীর পেয়েছেন ৪১৪৬ ভোট। আর ‘চ’ প্যানেলের প্রার্থী প্রফেসর আবেদ নোমানী পেয়েছেন ৩১৭৬ ভোট। সভাপতি পদে সর্বমোট ভোট পড়েছে ১২৮০৯টি। মোট ভোটার ১৫৫০০ প্রায়। সেই হিসেবে ভোট কাস্টিং হয়েছে প্রায় ৮২.৬৩%।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে সভাপতি পদে মোট ভোট পড়েছে ১২৮০৯টি আর সেক্রেটারি পদে মোট ভোট পড়েছে ১২৪৬১টি। সভাপতি পদে প্রার্থী ৫ জন আর মহাসচিব পদে প্রার্থী ৬ জন হলেও সভাপতি পদে ভোট বেশি পড়েছে ৩৪৮টি। অর্থাৎ ৩৪৮  জন ভোটার মহাসচিব পদে ভোটই দেননি কিন্তু সভাপতি পদে দিয়েছেন। মহাসচিব পদে ‘চ’ প্যানেলের প্রার্থী ২৪ বিসিএস এর ইসলামের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো: শওকত হোসেন মোল্যা সর্বোচ্চ ৫১৮৯ ভোট পেয়েছেন।  ’চ’ প্যানেলের সভাপতি প্রার্থী পেয়েছেন ৩১৭৬ ভোট। বুঝা যাচ্ছে ‘চ’ এর প্যানেল ভোটের বাইরে ২০১৩টি ভোট মহাসচিব প্রার্থী অন্য প্যানেল থেকে পেয়েছেন। আর এ ভোটগুলো যে বিএনপি সমর্থিত প্যানেল থেকে এসেছে তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। কারণ বিএনপি সমর্থিত ‘ক’ প্যানেলের প্রার্থী ড. মো: মাসুদ রানা খান পেয়েছেন মাত্র ৪৯৬ ভোট। বিএনপির নির্ধারিত ভোট এবার ‘চ’ প্যানেলেই পড়েছে।

মহাসচিব পদে ‘খ’ প্যানেলের প্রার্থী সৈয়দ জাফর আলী ৩৪২৬ ভোট পেয়েছেন। আর ‘ঘ’ প্যানেলের প্রার্থী মোছা: রেহেনা পারভীন পেয়েছেন ৩,২৯০ ভোট। উপরোক্ত দুই প্যানেলের মহাসচিব প্রার্থী ‘চ’ প্যানেলের মহাসচিব প্রার্থী থেকে প্রায় ১৭০০/১৮০০ ভোট কম পেয়েছেন। এতে কি প্রমাণিত হয় যে ‘চ’ প্যানেলের মহাসচিব প্রার্থী অধিক জনপ্রিয়? আসলে তা নয়। বিএনপি সমর্থিত ‘ক’ প্যানেলের ভোট অধিকাংশ ‘চ’ প্যানেলের মহাসচিবের দিকে গিয়েছে। ফলে তিনি বেশি ভোট পেয়েছেন। এটা নির্বাচনের ঠিক একদিন আগেই গোপন সমঝোতার মাধ্যমে হয়েছে বলে বিশ্বস্তসূত্রে জানা গিয়েছে।  

 ‘চ’ প্যানেলের সভাপতি আর ‘খ’ ও ‘ঘ’ প্যানেলের মহাসচিব প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট তিন-সাড়ে তিন হাজারের মতো। তাহলে ধরে নেওয়া যায় উল্লেখযোগ্য এই তিনটি প্যানেলের প্যানেল ভোট কমবেশি তিন/সাড়ে তিন হাজার। কিন্তু মহাসচিব পদে নির্বাচিত মো: শওকত হোসেন মোল্যা পেয়েছেন ৫১৮৯ ভোট। যা নির্বাচিত সভাপতির পদের চেয়েও ৩৩৯ ভোট বেশি। এতে কি প্রমাণিত হয় যে মহাসচিব সভাপতির চেয়েও বেশি জনপ্রিয়? বিষয়টি আসলে তা নয়। এখানে একটি কৌশল করা হয়েছে। ‘খ’ প্যানেল আর ‘ঘ’ প্যানেল প্যানেল ভোট পেলেও ‘চ’ প্যানেলের মহাসচিব এবং কোষাধ্যক্ষ ‘ক’ প্যানেল তথা বিএনপির প্যানেল ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে।

কোষাধ্যক্ষ পদে মোট ভোট পড়েছে ১২০৯৪টি। এর মধ্যে ‘চ’ প্যানেলের এসএম কামাল আহম্মেদ সর্বোচ্চ ৪৪২৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। ‘ক’ প্যানেল তথা বিএনপির প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ৫০৭ ভোট। পর্যালোচনা করে দেখা যায় বিএনপির প্যানেল ভোটের সবগুলোই একটি বিশেষ গোষ্ঠী সমর্থিত ‘চ’ প্যানেলের পক্ষে পড়েছে। ফলে মহাসচিব এবং কোষাধক্ষ্যের মত গুরুত্বপূর্ণ দু’টি পদ ঐ বিশেষ গোষ্ঠীর অনুকূলে চলে যায় । অবশ্য কেউ কেউ বলেন, ৩৪ ব্যাচ থেকে ৩৮ ব্যাচ পর্যন্ত প্রায় ৫ হাজার তরুণ সদস্য এবারই প্রথম ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তাদের ভোটও ‘চ’ প্যানেলের পক্ষে পড়েছে বেশি। তাহলে কি বলা যায়, তরুণ ক্যাডার সদস্যবৃন্দের অধিকাংশই না বুঝে ‘চ’ প্যানেলকে ভোট দিয়েছে?

ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তরুণ প্রজন্ম তেমন একটা বিভ্রান্ত হয়নি। মূল পদগুলোর ভোট নির্ধারিত হয়েছে বিএনপি সমর্থিত ‘ক’ প্যানেলের ভোটের জোয়ারে। কারণ গতবারের নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী বিএনপি সমর্থিত নাসরিন-রাব্বী প্যানেলের নির্ধারিত ভোট প্রায় ৩০০০। এবারের নির্বাচনে উক্ত ভোট ‘ক’ প্যানেলে পরেনি। সভাপতি প্রার্থী প্রফেসর মো: তৌফিক আহম্মদ পেয়েছেন মাত্র ৪৪১ ভোট। মহাসচিব পেয়েছেন ৪৯৬ ভোট। কোষাধ্যক্ষ পেয়েছেন ৫০৭ ভোট। বাকি আড়াই হাজার ভোট কোথায় গিয়েছে? অভিজ্ঞজনেরা বলেন সে ভোট গিয়েছে ঐ বিশেষ গোষ্ঠীর সমর্থিত ‘চ’ প্যানেলের পক্ষে।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সাংগঠনিক একমাত্র প্ল্যাটফরম হচ্ছে এই সমিতি। এটি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি নামে পরিচিত। আশির দশকের মাঝামাঝি এই সমিতি গঠিত হলেও এটি নিবন্ধিত নয়। ফলে প্রায় ১৫৫০০ ক্যাডার সদস্যের এই সমিতি কার্যতঃ অনিবন্ধিতভাবেই পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে বিশাল এই সমিতি অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই সমিতির কর্তৃত্ব মূলতঃ কয়েকজন ব্যক্তির কাছেই ঘুরে ফিরে থাকতো। ২০১৩ সালে প্রথম এই প্রথার বিরুদ্ধে আঘাত হানা হয়। এর আগে নির্বাচন না হয়ে সিলেকশনের মাধ্যমেই সমিতির পদগুলো পূরণ হতো। ২০১৩ সালের নির্বাচনে শফিক-শাহেদ প্যানেল প্রচলিত প্রথার বিরুদ্ধে প্রথম আঘাত হানে। শত প্রতিকূলতার মধ্য থেকেও কয়েকটি কেন্দ্রীয় এবং কয়েকটি নির্বাহী সদস্যপদ লাভ করে। সে নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত নাসরিন-রাব্বী প্যানেল জয়লাভ করে এবং বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে। এতে সরকারের গোয়েন্দা রিপোর্টে শিক্ষা ক্যাডার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা জন্ম নেয়। উল্লেখ্য এবারের নির্বাচনেও ’খ’ এবং ‘চ’ প্যানেল থেকে 'বেগম খালেদা জিয়াকে ফুল দেওয়া' কয়েকজন নির্বাচিত হয়েছেন বলে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের অভিযোগ।  

২০১৬ সালের নির্বাচনে মহাসচিব সহ অধিকাংশ পদে শাহেদুল খবির চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন প্যানেল নির্বাচিত হয়। সে সময় কৌশলগত কারণে প্রফেসর মাসুমে রাব্বানী এবং শাহেদুল খবির চৌধুরী একত্রেই  প্যানেল দিয়েছিলেন। সেবারও ষড়যন্ত্র করে বিএনপি-জামায়াতের ভোটে স্বতন্ত্র সভাপতি প্রার্থীকে পাস করানো হয়। প্রফেসর মাসুমে রাব্বানীকে সভাপতি পদে কৌশলে হারিয়ে দেওয়া হয়। ১২৩টি পদের ১২১টি পদে মাসুম-শাহেদ প্যানেল জিতলেও  স্বতন্ত্র সভাপতি পদপ্রার্থী প্রফেসর আইকে সেলিমউল্লাহ খোন্দকারকে ঐ বিশেষ গোষ্ঠীর প্যানেল ভোটগুলো দিয়ে জিতিয়ে আনে। ফলে স্বতন্ত্র সভাপতির সাথে মহাসচিবের আদর্শগত দ্বন্দ্ব থেকে যায় এবং সমিতির নেতৃত্ব বিভাজিত হয়ে যায়। এবার ভিন্ন কৌশল নেওয়া হয়েছে। প্রফেসর শাহেদুল খবির চৌধুরীকে ভোটে পরাজিত করার জন্য নোংরা অনেক কৌশল নেওয়া হয়েছিল। নির্বাচনের আগে নানান ধরনের মিথ্যাচার এবং অপকৌশলও ‘ঘ’ প্যানেলের সভাপতি প্রার্থীর জনপ্রিয়তাকে এতটুকু কমাতে পারেনি। কিন্তু মহাসচিব এবং কোষাধ্যক্ষ পদে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর জয়লাভ শিক্ষা ক্যাডারে অশনিসংকেত ডেকে আনবে বলে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা। 

এবারের নির্বাচনে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যনীয় এবং তা হলো বর্তমান সরকার সমর্থক বলে দাবিকৃত দুইটি প্যানেলের ভোট ভাগ হয়ে যাওয়া। ‘খ’ প্যানেল এবং ’ঘ’ প্যানেল উভয়ই বর্তমান সরকার সমর্থক বলে দাবি করে। কিন্তু ‘ঘ’ প্যানেলকে ঠেকানোর জন্য ‘খ’ প্যানেল এমন সব বিতর্কিত ব্যক্তিবর্গের সাথে ’ঐক্য’ গড়ে যাদের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ আছে। ফলে ‘ক’ প্যানেল, ‘খ’ প্যানেল এবং ‘চ’ প্যানেলের বিরুদ্ধে একাই লড়তে হয়েছে ‘ঘ’ প্যানেলকে। এছাড়াও সরকার সমর্থিত ‘লাল-সবুজ’ নামে একটি প্যানেল (ঙ) কোষাধ্যক্ষ সহ কয়েকটি পদে প্রার্থীতা দিয়ে ’ঘ’ প্যানেলের অনেক ভোট নষ্ট করেছে। কোষাধ্যক্ষ পদের কথাই ধরা যাক, এ পদে ’চ’ প্যানেল থেকে এস এম কামাল আহম্মেদ ৪৪২৮ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মাসুদা বেগম তোফা ২৯৪৬ ভোট পেয়েছেন। তথাকথিত সরকার সমর্থক বলে পরিচিত লাল-সবুজ প্যানেল থেকে কোষাধ্যক্ষ পদে চন্দ্র শেখর হালদার ১৩৮৫ ভোট পেয়েছেন। যদি তিনি না দাঁড়াতেন তাহলে এই ভোটগুলো মাসুদা বেগম তোফা পেলে ‘ঘ’ প্যানেল থেকে কোষাধ্যক্ষ পদ জেতার সম্ভাবনা বেড়ে যেতো। যদিও ‘ঙ’ প্যানেল বা লাল-সবুজ প্যানেল একটিও পদ পায়নি কিন্তু ‘ঘ’ প্যানেলের ভোট নষ্ট করেছে বলে ক্যাডার কর্মকর্তাদের অভিমত। ক্যাডারের জন্য নিবেদিতপ্রাণ মাসুদা বেগম তোফার হার শিক্ষা ক্যাডারকে ভোগাবে বলেই অনেকে মনে করেন।

’ঘ’ প্যানেলের মহাসচিব প্রার্থী নির্বাচন নিয়েও দোদূল্যমানতা এই প্যানেলকে ভুগিয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই অন্যান্য প্যানেল তাদের প্রার্থীতা নিয়ে গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করলেও ‘ঘ’ প্যানেল বেশ পিছিয়ে ছিল। নমিনেশন পেপার সাবমিট করার আগমুহুর্তে অনেকটা তড়িঘড়ি করে সমিতির কাছে অচেনা নতুন একজনকে মহাসচিব পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়। নির্বাচনের আগে ‘শাহেদ-মইনুল’ প্যানেলের নাম শোনা গেলেও হঠাৎ করেই ’শাহেদ-রেহেনা’ প্যানেল শিক্ষা ক্যাডারের নবীন ভোটারদের হতবাক করে দেয়। কারণ ‘ঘ’ প্যানেলের মহাসচিব পদপ্রার্থী মোছা: রেহেনা বেগমকে সমিতিতে অবদানের ক্ষেত্রে কেউই স্মরণ করতে পারছিলেন না। মূলধারা নামে ‘ঘ’ প্যানেলের মহাসচিব পদে একজনকে চাপিয়ে দেওয়া ক্যাডার কর্মকর্তারা মেনে নিতে পারেন নি। তাই ’ঘ’ প্যানেলের একজন অপরিচিত মহাসচিবের চেয়ে ফেসবুক সেলিব্রেটি একজনকে বেছে নিয়েছেন বলেই অনেকের ধারণা।

এবারের বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির নির্বাচনে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা ‘ঘ’ প্যানেলের পরীক্ষিত অনেক কর্মকর্তাকে সঠিক মূল্যায়ন করতে পারেন নি। যেমন- আইন সচিব পদে এএসএম এমদাদুল কবীর ৩১৬৭ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন। ‘খ’ প্যানেল থেকে মো: দেলোয়ার হোসেন ৩৩৪৯ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন। আর ’চ’ প্যানেল থেকে মো: নজরুল ইসলাম পেয়েছেন ৩১২২ ভোট। সমিতির বিগত টার্মে এমদাদুল কবীর শিক্ষা ক্যাডার স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেকগুলো মামলার বাদী এবং মামলাগুলো তিনি অনেক যত্নসহকারে পরিচর্যা করতেন। এখন এ মামলাগুলো নতুন আইনসচিব কতটুকু দেখভাল করতে পারবেন তা দেখার অপেক্ষায় শিক্ষা ক্যাডার। তবে সহ আইন সচিব পদে মো: রুহুল আমিনের বিজয় ‘ঘ’ প্যানেলকে অনেকটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।

এছাড়াও সমিতির জন্য নিবেদিতপ্রাণ বলে পরিচিত সৈয়দ মইনুল হাসানের প্রার্থীতা ভুলের কারণে বাতিল হয়ে যাওয়ায় তিনি নির্বাচনই করতে পারেন নি। যুগ্ম মহাসচিব ( ঢাকা মহানগর, পুরুষ ) পদে তিনি প্রার্থীতা জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু ভোটার নম্বর ভুলের কারণে প্রার্থীতা বাতিল হয়ে যায়। শেষ সময়ের তড়িঘড়ির ফল এই প্রার্থীতা বাতিল হওয়া যা ‘ঘ’ প্যানেলের পুরো ফলাফলের উপরই প্রভাব ফেলেছে। 'শাহেদ-মইনুল' প্যানেল নির্বাচন করলে এই প্যানেলের প্রতি অনেকের আস্থা বেড়ে যেতো এবং নির্বাচনে তার প্রভাব পড়তো বলে বোদ্ধামহলের ধারণা।  ‘ঘ’ প্যানেলের প্রার্থীতা নিয়ে শুরু থেকেই একটা অগোছালো ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। যার ফলাফল নির্বাচনে ফুটে ওঠেছে।

তবে ’ঘ’ প্যানেলের সমর্থকরা এই কারণে খুশি যে, সভাপতি পদে বিজয়ী প্রার্থী তাদের। এছাড়া সহসভাপতি (কুমিল্লা-নোয়াখালী অঞ্চল) সহ যুগ্ম মহাসচিব, সাংগঠনিক সচিব পদেও বেশ কিছু পদ পেয়েছে। তাছাড়া তথ্য ও গবেষণা সচিব, সেমিনার সচিব পদগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। সহপ্রচার, সহ আইন, সহ প্রকাশনা এবং সহ আন্তর্জাতিক সচিবের পদগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সহ আইন সচিব পদে ৩৩ ব্যাচের নবীন কর্মকর্তা মো: রুহুল আমিনের বিজয়ে অনেকটা স্বস্তির ভাব এসেছে। কারণ বিগত সমিতির দায়েরকৃত মামলাগুলো পরিচর্যা এবং পরিচালনার জন্য এই পদটি গুরুত্বপূর্ণ। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে অনেক বিশ্লেষণ চলছে। একটি ঝুলন্ত কমিটি শিক্ষা ক্যাডারের উন্নয়নে কতদূর কি করতে পারে তা দেখার অপেক্ষায় ষোলো হাজার ক্যাডার কর্মকর্তা।  

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের নির্বাচনের পর ২০১৮ সালে নির্ধারিত মেয়াদ শেষে করোনা এবং অন্যান্য অনিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতির কারণে নির্বাচন কয়েকদফা পিছিয়ে যায়। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় চলতি বছরের শুরুতেই নির্বাচনী আবহাওয়া বইতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালের মার্চের ২০ তারিখ অনুষ্ঠিত হয় কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন। এবারের নির্বাচিত সমিতি একটি ঝুলন্ত সমিতি হয়েছে বলে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের অভিমত। কারণ এক প্যানেল থেকে সভাপতি, আরেক প্যানেল থেকে মহাসচিব এবং কোষাধ্যক্ষ, অন্য আরেক প্যানেল থেকে কেন্দ্রীয় এবং নির্বাহী সদস্যের অধিকাংশ পদ প্রাপ্তিকে অনেকেই মঙ্গলজনক বলে মনে করছেন না। গতবারের অভিজ্ঞতা থেকে ক্যাডার কর্মকর্তারা তা-ই ধারণা করছেন। কারণ গতবার ’মাথাকাটা ‘ সমিতি ক্যাডার কর্মকর্তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে একত্রে কাজ করতে পারেনি। এবার এক প্যানেলের মাথা, আরেক প্যানেলের গলা-বুক এবং অন্য আরেক প্যানেলের পা নিয়ে কতদূর যেতে পারবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে আশার কথা এই যে, এবারের নির্বাচনে যিনি সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন, প্রফেসর মো. শাহেদুল খবির চৌধুরী, তিনি একজন ক্যারিশমেটিক নেতা বলেই অভিজ্ঞমহলের ধারণা। তাই ঝুলন্ত সমিতি হলেও তিনি সভাপতির পদে থেকে দক্ষ নেতৃত্ব দিয়ে সমিতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবেন বলে ক্যাডার কর্মকর্তাবৃন্দ মনে করেন। 

শিক্ষাপত্রিকার পাঠকদের জন্য  নির্বাচনের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল        


এ জাতীয় আরো খবর