রবিবার, ২২ মে ২০২২, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

সরকারি কলেজেও কমিটি : শিক্ষা ক্যাডারের তীব্র প্রতিবাদ

  • Fion
  • ২০২২-০২-০৭ ০১:৪১:০৪
image

অধিভুক্ত সরকারি কলেজগুলোতেও গভর্নিং বডি গঠন করতে বলছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। যদিও দেশের সরকারি কলেজগুলো একাডেমিক কাউন্সিলের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। আর সরকারি কলেজ ও মাদরাসায় শিক্ষাদান করে আসছেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা। হঠাৎ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় বলছে, ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে জারি হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুসারে সরকারি-বেসরকারি সব কলেজ নিয়মিত গভর্নিং বডি দ্বারা পরিচালিত হবে। সারাদেশে পুরনো ও নতুন সরকারি কলেজের সংখ্যা ছয় শতাধিক।  জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তিন শতাধিক নতুন সরকারিকৃত কলেজকেও গভর্নিং বডি গঠনের আদেশ দেয় গতমাসে। 

গতকাল রোববার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেশের সব পুরনো সরকারি কলেজকে অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাঠাতে বলা হয়েছে। এ নির্দেশনা দিয়ে অধিভুক্ত সরকারি কলেজগুলোর অধ্যক্ষদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

এ চিঠি পাওয়ার পরপরই তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে এই আদেশ প্রত্যাহার দাবি করেছেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত সরকারি কলেজ শিক্ষকরা। তারা বলছেন, ত্রিশ বছর আগে বিএনপি সরকারের আমলে তৈরি করা বিধান এই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কেন বাস্তবায়ন করার ইচ্ছা হলো উপচার্যের, তা খতিয়ে দেখা দরকার। ফেসবুকে তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তারা। তারা বলছেন, যেখানে এমপিওভুক্ত স্কুল-কলেজ থেকে কমিটি প্রথা তুলে দেয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে, সেখানে কেন সরকারি কলেজে নতুন করে কমিটি চাপিয়ে দেয়ার ইচ্ছা জাগলো?

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সর্বশেষ সভাপতি ও ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকার গতকাল রোববার রাতে  ‘অবিলম্বে এই চিঠি প্রত্যাহার করতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কোনো দুরভিসন্ধি রয়েছে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি।’   

তিনি বলেন, দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কমিটি নিয়ে সমালোচনা চলছে।  দেশের সরকারি কলেজগুলো সঠিকভাবে চলছে, এ পরিস্থিতিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ‘উল্টো পথে হেটে’ সরকারি কলেজগুলোকেও অ্যাডহক কমিটি গঠনের নির্দেশ দিল। 

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মশিউর রহমানের নির্দেশে ৩০ বছর পুরনো আইনের নতুন করে নির্দেশনা জারি করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা। 

রোববার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ফাহিমা সুলতানা স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৯২ সনের ৩৭ নং আইন' এ ধারা ৪০ উপধারা (২) এ উল্লেখ রয়েছে ‘প্রত্যেক কলেজ একটি গভর্নিং বডি দ্বারা পরিচালিত হবে এবং গভর্নিং বডির গঠন, ক্ষমতা ও কার্যাবলি সংবিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে।’এ অবস্থায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গভর্নিং বডি (সংশোধিত) সংবিধি ২০১৯ এর ধারা ৪ (ক) মোতাবেক ‘প্রত্যেক অধিভুক্ত কলেজ (সরকারি ও বেসরকারি) নিয়মিতভাবে গঠিত একটি গভর্নিং বডি দ্বারা পরিচালিত হবে’বিধায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি কলেজে বিধি মোতাবেক একটি অ্যাডহক কমিটি গঠনের লক্ষ্যে একই সংবিধির ধারা ৬ (ক) অনুযায়ী অ্যাডহক কমিটির প্রস্তাব ই-মেইলে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হলো। 

জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক  বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুসারে আমরা কমিটি গঠনের প্রস্তাব চেয়েছি। এর আগেও আমরা সরকারিকৃত কলেজগুলোকে অ্যাডহক কমিটি গঠন করতে বলেছি। সে অনুযায়ী এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। 

যদিও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এ নির্দেশনা মানতে পারছেন না বিভিন্ন সরকারি কলেজের কর্মরত শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা।  তারা বলছেন, এটি ষড়যন্ত্র। সারাদেশের শিক্ষাঙ্গনে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টার অংশ হিসেবে এ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। সরকারি কলেজগুলো দীর্ঘদিন অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। 

১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন জারি হলেও, ৩০ বছর পর কেন কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেয়া হলো এমন প্রশ্নের জবাবে ভারপ্রাপ্ত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেন, ‘আমাদের উপাচার্য মহোদয়ের নির্দেশে এ চিঠি দেয়া হয়েছে’।

সরকারি কলেজের গভর্নিং বডি বা অ্যাডহক কমিটি কত সদস্যের হবে জানতে চাইলে তিনি আরও জানান, আমাদের সংবিধি অনুসারে এ গভর্নিং বডি গঠিত হবে। অ্যাডহক কমিটি বা গভর্নিং বডিতে ১১ জন সদস্য থাকবেন।

শিক্ষা ক্যাডারের সিনিয়র সদস্যরা বলছেন, বিএনপির আমলে ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে জারি হওয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন ধরে ৩০ বছর পর নির্দেশনা জারি হলো। এর আগে ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আফতাব আহমাদের সময়ও এ নির্দেশনা জারি হয়েছিল। পরে তীব্র প্রতিবাদের মুখে তা বাতিল হয়। 

সরকারিকৃত কলেজের জন্যও এসেছে একই নির্দেশনা :

এর আগে সরকারিকৃত কলেজগুলোর অ্যাডহক কমিটি গঠন করতে বলেছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কলেজগুলোকে অ্যাডহক কমিটি গঠনের প্রস্তাব ইমেইলে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এ নির্দেশনার পর শিক্ষকরা এর প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। 

গত কয়েক বছরে নতুন সরকারিকৃত তিনশতাধিক কলেজের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত হয়েছে। এ কলেজগুলোর আর্থিক কার্যাবলি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুসারে ডিসি-ইউএনও এবং অধ্যক্ষদের যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হচ্ছে। আর প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে একাডেমিক কাউন্সিলের মাধ্যমে। কিন্তু হঠাৎ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা আত্তীকরণ বিধিমালার মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোকে অ্যাডহক কমিটি গঠনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। 

সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষকরা এর প্রতিবাদ জানালেও সে নির্দেশনা এখনো প্রত্যাহার করেনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। 

কেন এমন কমিটি গঠনের উদ্যোগ তা জানার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মশিউর রহমানকে । 


এ জাতীয় আরো খবর