রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ৯ কার্তিক ১৪২৮

মধ্যবিত্তের আয় কমবে সাশ্রয় হবে সরকারের

  • Fion
  • ২০২১-০৯-২৩ ০৮:৩৯:২৫
image

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগে মুনাফার হার কমানোর ফলে বড় সঞ্চয়কারীদের অর্থাৎ মধ্যবিত্তের আয় কমে যাবে। প্রান্তিক বা ছোট সঞ্চয়কারীদের আয় অপরিবর্তিত থাকবে। কমবে প্রাতিষ্ঠানিক সঞ্চয়কারীদের আয়ও। প্রবাসীরাও ওয়েজ আর্নার্স বন্ডের বিপরীতে মুনাফা কম পাবেন।

এতে সার্বিকভাবে সুদ বাবদ সরকারের ব্যয় সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে মুদ্রা বাজারে যে অস্থিরতা ছিল সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর ফলে তাতে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে।

সরকারের নীতিনির্ধারক, দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার ও সঞ্চয়কারীরা এসব কথা বলেছেন।

তারা আরও বলেছেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর ফলে এ খাতে আবার এ ধরনের অস্থিরতা তৈরি হবে। যেভাবে এবার কোটা পদ্ধতি করে মুনাফার হার আরোপ করা হয়েছে সেটি বাস্তবায়ন করা বেশ জটিল। একই সঙ্গে আগে কেনা সঞ্চয়পত্রের মুনাফা আগের হারেই পাওয়া যাবে। তবে কোটা পদ্ধতি আরোপ করা হবে। ফলে আগের সঞ্চয়পত্রের মুনাফা পেতেও জটিলতা বাড়বে।

মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকের সাধারণ হিসাব ও দুটি ডলার বন্ড ছাড়া সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানো হয়েছে। তবে এবারই প্রথম কোটা পদ্ধতি আরোপ করে ছোট সঞ্চয়কারীদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের ওপর মুনাফার হার কমানো হয়নি। আগের হারই এতে বহাল রাখা হয়েছে।

১৫ লাখ টাকার বেশি থেকে ৩০ লাখ পর্যন্ত বিনিয়োগে মুনাফার হার কমানো হয়েছে ১ শতাংশ এবং ৩০ লাখ টাকার বেশি হলে মুনাফার হার কমানো হয়েছে ২ শতাংশ। প্রবাসীদের জন্য ওয়েজ আর্নার্স বন্ডে ৩০ লাখের বেশি থেকে ৫০ লাখ পর্যন্ত একটি কোটা এবং ৫০ লাখের বেশি হলে আরও একটি কোটা যুক্ত করা হয়েছে। এতে তিন ধাপে মুনাফার হার কমেছে ৩ শতাংশ। অর্থাৎ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিদ্যমান ১২ শতাংশ, ১৫ লাখের বেশি থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ১১ শতাংশ, ৩০ লাখের বেশি থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ১০ শতাংশ এবং ৫০ লাখ টাকার বেশি হলে ৯ শতাংশ মুনাফা দেওয়া হবে। আগে এতে যে কোনো অঙ্কের বিনিয়োগের ওপর ১২ শতাংশ মুনাফা দেওয়া হতো।

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর ফলে বিভিন্ন মহলের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বড় ও প্রাতিষ্ঠানিক সঞ্চয়কারীরা একে ভালো চোখে দেখছেন না। কেননা প্রাতিষ্ঠানিক সঞ্চয়কারীদের বিনিয়োগ রয়েছে কেবল ৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রে। বিশেষ করে প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ তারা এতে বিনিয়োগ করে যে মুনাফা পান তা কর্মীদের মধ্যেই বণ্টন করে দেওয়া হয়। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগে কোনো ঊর্ধ্বসীমা না থাকায় সেগুলো হয় বড় অঙ্কের। এতে তাদের মুনাফা গড়ে ২ শতাংশ কমবে।

বিশেষ করে সরকারি অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ প্রাপ্ত টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করে সে মুনাফা থেকে সংসার খরচ চালান। তাদের বিনিয়োগ ৩০ লাখের বেশি। ফলে তারাও গড়ে ২ শতাংশ মুনাফা কম পাবেন। পরিবার সঞ্চয়পত্রের চাহিদাও বেশ। কেবল মহিলারাই এতে বিনিয়োগ করতে পারেন। ফলে সঞ্চয়ের বড় একটি অংশই পরিবারের পক্ষে মহিলাদের নামে করেন। বিনিয়োগের অঙ্কও ৩০ লাখের বেশি। ফলে এ ক্ষেত্রেও ২ শতাংশ মুনাফা কম পাবেন।

তবে সাধারণ সঞ্চয়কারীরা যারা ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন তাদের মুনাফার হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বুধবার সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর ক্ষেত্রে প্রান্তিক বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনা করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকায় এর হার কমানো হয়েছে। এর মুনাফার হার বেশি হওয়ায় অর্থনীতির অন্য চালিকাশক্তিগুলো সমস্যায় পড়ছিল। মুনাফার হার কমানোর ফলে সার্বিক অর্থনীতির সুদের হারে একটি ভারসাম্য আসবে।

তিনি আরও বলেন, সঞ্চয়পত্রের যে মুনাফার হার দেওয়া হয়েছে তাতে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। এক কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগের ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছে।

সুদের হার কমানোর ফলে সরকারের ব্যয় সাশ্রয় হবে কত? এমন প্রশ্নের জবাবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব দেননি অর্থমন্ত্রী। তবে তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ দেখা হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় হার বাড়ানো বা কমানো একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটা কখনো বাড়বে, কখনো কমবে। প্রয়োজনে আবার বাড়তেও পারে।

সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ৯২ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে প্রতিবছর সরকার গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি হিসাবে দিচ্ছে। সুদ দিচ্ছে গড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ। কিন্তু সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে ২ থেকে ৫ শতাংশ সুদে পাচ্ছে। বিদেশি ঋণও পাচ্ছে ১ থেকে ২ শতাংশ সুদে।

এছাড়া সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বেশি হওয়ায় সঞ্চয়ের বড় অংশই চলে যেত এ খাতে। এতে প্রতিবছরই গড়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি সঞ্চয়পত্র বিক্রি হতো। ব্যাংকের সুদের হার কম থাকায় আমানত যেত কম। ঝুঁকির কারণে শেয়ারবাজারেও টাকা কম যেত। এসব কারণে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর জন্য ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে একটি চাপ ছিল।

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর আগে বহুমুখী চিন্তা করার দরকার ছিল। সঞ্চয়পত্র শুধু সরকারের ঋণ নেওয়ার একটি উপকরণ নয়। এর মাধ্যমে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর একটি দায়িত্বও পালন করে। অনেকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের মুনাফা থেকে জীবিকা নির্বাহ করে। মানুষের সঞ্চয়ের একটি নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা দরকার।

এখন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগের মুনাফা কম। যা মূল্যস্ফীতির কারণে ক্ষয় হচ্ছে। এছাড়া ঝুঁকিও বেড়েছে। শেয়ারবাজারেও বিনিয়োগে ঝুঁকি রয়েছে। এসব মিলে সঞ্চয়পত্রকেই মানুষ নিরাপদ ভাবতেন। কিন্তু এর সুদের হার কমানোর ফলে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ কোনো খাতে চলে গেলে তা বিপজ্জনক হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ঋণের সুদের হার কমানোর ফলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর দাবি উঠেছিল। সরকার সে সময়ে কমায়নি। করোনায় যখন মানুষের আয় কমেছে তখন এর মুনাফা কমানো হয়েছে। এটি ঠিক হয়নি। সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমানোর আগে লাভজনক নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি করা জরুরি। সেটি হয়নি। ফলে এখন বাড়তি মুনাফার আশায় বিনিয়োগ যাবে ঝুঁকিপূর্ণ খাতে। এটি অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান, এনসিসি এবং মেঘনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও এফএএস ফাইন্যান্সের আদালত নিয়োজিত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, হঠাৎ সঞ্চয়পত্রের বিভিন্ন স্কিমে মুনাফার হার কমানোর ফলে কিছুটা বেকায়দায় পড়বে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। বিশেষ করে চাকরিজীবী ও পেনশন হোল্ডাররা। তারা কর্মজীবন শেষে অবসরে গেলে পেনশন বাবদ একসঙ্গে অনেক টাকা পেয়ে থাকেন।

সে অঙ্ক নিঃসন্দেহে ১৫ বা ৩০ লাখের ওপরে। এই শ্রেণি কিছুটা বঞ্চিত হবেন। আর এই ঘোষণা জাতীয় বাজেটেও দিতে পারতেন। তাতে সাধারণ মানুষের পূর্বপ্রস্তুতি নিতে সুবিধা হতো। এছাড়া ধাপে ধাপেও ঘোষণা আসতে পারত। এসবের কোনোটিই মানা হয়নি। মনে রাখতে হবে প্রতিবছর সঞ্চয়পত্র খাতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা যে ভর্তুকি দেয় সরকার, তা কিন্তু অন্য কেউ নয়; সাধারণ মানুষ পেয়ে থাকেন। আর এই সাধারণ মানুষই আবার সরকারকে নানাভাবে ভ্যাট-ট্যাক্স দিয়ে আসছেন।


এ জাতীয় আরো খবর