বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

আদিকাল থেকেই চলছে টিকার রাজনীতি

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২০২১-০৯-১৪ ১০:৫০:৪৯
image
ছবি-সংগৃহীত
সাধারণত টিকা গ্রহণ এবং প্রদানের মধ্যে কোনো রাজনীতি থাকার কথা নয়। রাষ্ট্র কর্তৃক সার্বজনীন টিকা প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে অথবা জনগণ নিজেদের টাকায় টিকা সংগ্রহ করে শরীরে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। সংক্রামক রোগের সংক্রমণকে প্রতিহত করার জন্য মানুষ টিকা নিতে আগ্রহ প্রকাশ করবেন—এটাই স্বাভাবিক। টিকা প্রদান এবং গ্রহণ একটি মহত্ কাজ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। কিন্তু ১৭৯৬ সালে এডওয়ার্ড জেনারের গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কারের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোভিড-১৯-এর টিকা নিয়ে রাজনীতি চলছে। ১৮১৯ সালে মাদ্রাজ কুরিয়ার কেলভি ভিরুমবনের একটি নোট প্রকাশ করেন। তাতে উল্লেখ করা হয়, জেনারের টিকা আবিষ্কারের অনেক পূর্বে ভারতে গুটিবসন্তের টিকার পরিচিতি ছিল। তিনি প্রাচীন সংস্কৃতের একটি টেক্সট খুঁজে পান যেখানে গুটিবসন্তকে এড়ানোর পন্থা বলা হয়েছে। আর তিনি মনে করেন, এড়ানোর সেই পন্থা হচ্ছে নিশ্চিতভাবে টিকা। নিয়েলস ব্রিমনেস একে ‘ধর্মীয় জালিয়াতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন (প্রফেসর পল গ্রিনো, দ্য পলেটিক্স অব ভ্যাকসিনেশন, ২০১৭, পৃষ্ঠা নং ৫১)। প্রকৃতপক্ষে এই নোটটি ছিল একজন ব্রিটিশ সিভিল সারভেন্টের কারসাজি। যেহেতু গুটিবসন্তের টিকা গরু থেকে তৈরি করা হয়, আর গরু হিন্দুদের কাছে পবিত্র প্রাণী। অতএব প্রাচীন সংস্কৃত টেক্সটে এই টিকার বর্ণনা রয়েছে এমন প্রচারণা ভারতের জনগোষ্ঠীকে টিকা গ্রহণে উত্সাহিত করবে। পশ্চিমা ওষুধকে দেশীয় ওষুধের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠা করা ছিল ব্রিটিশদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই জন্য তারা নানান কৌশল নিয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধকালে টিকা আবিষ্কার ও তার ব্যবহারে পরাশক্তিদ্বয়ের (যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন) মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি করে। আমরা জানি, পূর্ব ইউরোপ সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক ব্লকে ছিল। আর পশ্চিম ইউরোপ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পুঁজিবাদী ব্লকে। ১৯৫০-এর দশকের শুরুতে পূর্ব ইউরোপে ব্যাপক পোলিও মহামারি দেখা দেয়। ১৯৪৯ সালে রোমানিয়ায় পোলিও মহামারি শুরু হয় এবং ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত এটি বাড়তে থাকে। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া ও বুলগেরিয়াসহ পূর্ব ইউরোপের সব দেশ আক্রান্ত হয়। পোলিও অল্প বয়স্ক জনগোষ্ঠীকে শারীরিকভাবে অক্ষম করে দেয়। কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের ভবিষ্যত্ প্রজন্ম অক্ষম হয়ে গড়ে উঠবে এটি কমিউনিস্ট ইউটোপিয়ার সঙ্গে মানায় না। সমাজতান্ত্রিক ব্লকে পোলিও ভাইরাসের বিরুদ্ধে টিকা আবিষ্কারের চেষ্টা চালাতে থাকে। পূর্ব ইউরোপের এই করুণ পরিস্থিতি দেখে পুঁজিবাদী ব্লক টিকা আবিষ্কারে জোর প্রচেষ্টা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫০-এর দশকের মধ্যভাগে পোলিও ভাইরাসের বিরুদ্ধে সল্ক ভ্যাকসিন (টিকা) আবিষ্কার করে। যুক্তরাষ্ট্রের জনাস সল্ক এই ভ্যাকসিন তৈরি করেন এবং ১৯৫৫ সাল থেকে এর বিতরণ শুরু হয়। সল্ক ভ্যাকসিন ছিল নিষ্ক্রিয় ভাইরাস, যা রোগ প্রতিরোধে সঠিকভাবে কার্যকর ছিল না। কিন্তু সেবিন ভ্যাকসিন আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত পোলিও ভাইরাস প্রতিরোধে সল্ক ভ্যাকসিন চলতে থাকে। এমনকি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি করা সল্ক ভ্যাকসিন ব্যবহার করে। পোলিও টিকাকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সমাজতান্ত্রিক ও পুঁজিবাদী ব্লকের মধ্যে তৈরি হওয়া লৌহ পর্দা (আয়রন কার্টেন) ভেঙে যায়। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সঙ্গে টিকা আমদানির চুক্তি করে। দুই ব্লকের বিজ্ঞানীদের মধ্যে সীমিত আকারে হলেও অভিজ্ঞতা বিনিময় শুরু হয়। সল্ক ভ্যাকসিনের দুর্বলতা বুঝে আলবার্ট সেবিন পোলিও ভাইরাসের বিরুদ্ধে সক্রিয় (লাইভ) ভ্যাকসিন তৈরি করেন। দুই পরাশক্তির মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক এই পর্যায়ে তৈরি করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের আলবার্ট সেবিন ও রাশিয়ার মিখাইল চুমাকভ মিলে সোভিয়েত ইউনিয়নে লাইভ পোলিও টিকার সবচেয়ে বড় ট্রায়াল দেন। সফল ট্রায়ালের পর ১৬ ডিসেম্বর ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বাস্থ্যমন্ত্রী দুই মাসের শিশু থেকে ২০ বছরের সব নাগরিককে সেবিন টিকা দেওয়ার নির্দেশনা প্রদান করেন (দ্য পলেটিক্স অব ভ্যাকসিনেশন, পৃষ্ঠা ৮৬)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক ১৯৮৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী পোলিও নির্মূল পদক্ষেপের মূলে রয়েছে এই সেবিন টিকা। টিকা কেন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কারণ হয়েছে, এই নিয়ে অনেক মতামত পাওয়া যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর পল গ্রিনো (তিনি ২০১৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তার গবেষণার তথ্য-উপাথ্য সংগ্রহের জন্য ঢাকায় আসেন) এবং অন্যান্যরা দুটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন। ক) সরকারের নিজস্ব টিকা উত্পাদনের ক্ষমতা জাতীয় সার্বভৌমত্ব গঠনে এবং বজায় রাখতে ভূমিকা রেখেছে। খ) টিকায় অংশগ্রহণকারীগণের সম্প্রদায়গত ও নাগরিকত্বের অভ্যন্তরীণ গঠনের ওপর টিকার প্রচারণার সফলতা ও ব্যর্থতার প্রভাব রয়েছে (দ্য পলেটিক্স অব ভ্যাকসিনেশন, পৃষ্ঠা নং ২)। তত্ত্বটি ব্যাখ্যার দাবি রাখে। ১৯৫৭ সালের শেষ দিকে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) গুটিবসন্ত ও কলেরা প্রকোপ বেড়ে যায় এবং ১৯৫৮ সালে এসে এটি মহামারি আকার ধারণ করে। যথাসময়ে জনগণকে টিকা প্রদান করতে না পারায় মহামারিতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। পূর্ব পাকিস্তান মহামারি নিয়ন্ত্রণ ও ত্রাণ বিতরণ কমিটির সেক্রেটারি ইউসুফ আলী চৌধুরী ২৭ মে ১৯৫৮ সালে করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তব্যে উল্লেখ করেন, পূর্ব পাকিস্তানে এই পর্যন্ত মহামারিতে ১ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে (দ্য পাকিস্তান অবজারভার, ২৮ মে ১৯৫৮)। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯৫৮ সালের মহামারিকে মানুষ সৃষ্ট মহামারি হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি মহামারির জন্য প্রাদেশিক সরকারের অযোগ্যতা ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন (দৈনিক আজাদ, ১৪ মে ১৯৫৮)। ঢাকায় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক থমাস এইডেন কাকবার্ন ১৯৫৮ সালের প্রথম ছয় মাসে শুধু গুটিবসন্তে ২০ হাজার ৪৪৪ জনের মৃত্যুর বিষয়ে তার রিপোর্টে উল্লেখ করেন (পাবলিক হেলথ রিপোর্ট, জানুয়ারি ১৯৬০)। পূর্ব পাকিস্তানে প্রেরিত যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি টিমের কো-লিডার ড. ইউশারের বর্ণনায় অন্তর্নিহিত কারণ ফুটে ওঠে। ঢাকায় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মাসিক ৪৮ মিলিয়ন গুটিবসন্তের লিম্ফ তৈরির সক্ষমতা ছিল। কিন্তু ১৯৫৮ সালের এপ্রিল মাসে ভাইরাসজনিত কারণে ব্যাপক গোমড়ক লাগায় টিকা উত্পাদনের উপকরণ গরুর বাছুরের ঘাটতি দেখা দেয়। ফলে উত্পাদন ক্ষমতা ৪৮ মিলিয়ন থেকে ১৪ মিলিয়নে নেমে আসে (স্মল পক্স ইন ইস্ট পাকিস্তান, পৃ. ১২)। তাছাড়া ১৯৫৮ সালের রূঢ় বাস্তবতা হলো, পূর্ব পাকিস্তানের জনস্বাস্থ্য বিভাগ ছিল অত্যন্ত দুর্বল ও অবহেলার বিষয়। এখানকার অর্থের জোগান ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে সারা প্রদেশে স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। জেলা পর্যায়ে মাত্র ২৫ জন জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা ৪৬ মিলিয়ন মানুষকে জনস্বাস্থ্য সেবা প্রদান করতেন। সামগ্রিক এই পরিস্থিতির মধ্যে পাকিস্তান সরকার টিকা ও স্বাস্থ্য সেবায় সহযোগিতার জন্য বিদেশের কাছে আবেদন জানায়। আবেদনে সাড়া দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, ভারত, চীন, তুরস্ক, জার্মানি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য দেশ এবং সংস্থা গুটিবসন্তের টিকা প্রেরণ করে। তখনকার বাস্তবতায় পাকিস্তানের ডাকে যুক্তরাষ্ট্র সাড়া দেবে এবং টিকা প্রেরণ করবে—এটা ছিল স্বাভাবিক। কারণ, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জোট সিয়াটো ও সিনটোর সদস্য ছিল। টিকা সহায়তায় সমাজতান্ত্রিক ব্লকের অংশগ্রহণে যুক্তরাষ্ট্র সন্দিহান হয়ে পড়ে। টিকা প্রদানকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ এশিয়ায় পূর্ব পাকিস্তান স্নায়ুযুদ্ধের কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠা পাওয়া বাম ধারার ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির কর্মকাণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্র নজরদারি করতে শুরু করে। মহামারি, দুর্ভিক্ষ ও টিকার অভাব ইত্যাদি পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে পশ্চিমা পুঁজিবাদ বিরোধী করে তুলতে পারে, এই সন্দেহে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নয়ন হতে থাকে। প্রাদেশিক সরকার ১৯৫৮ সালের জুন মাসের মধ্যে ৪৬ মিলিয়ন মানুষের মধ্যে ৩০ মিলিয়ন মানুষকে টিকা দিতে সক্ষম হয়। তবে মহামারির প্রেক্ষিতে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাছে পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্য ও অব্যবস্থাপনা পরিষ্কার হতে থাকে। লেখক: ড. মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা, প্রফেসর পল গ্রিনোর গবেষণা সহকারী ও জনস্বাস্থ্য গবেষক

এ জাতীয় আরো খবর