বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

টিএমইডি সচিবের বক্তব্য জাতির পিতার উন্নয়ন দর্শনের পরিপন্থী : শাহেদুল খবির চৌধুরী

  • স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
  • ২০২১-০৮-৩০ ০৩:১৫:১৪
image

গত ২৫ আগস্ট ২০২১ খ্রি. তারিখে বাংলা ট্রিবিউন নামের একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের (টিএমইডি) সচিব মো. আমিনুল হকের উদ্ধৃতি নিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত সংবাদে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের পেশাগত এবং মর্যাদাগত অবস্থানকে হেয় করা হয়েছে বলে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের অভিযোগ। একজন সচিব একটি দায়িত্বপূর্ণ পদে থেকে এরকম মন্তব্য করতে পারেন না বলে ষোল হাজার শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা মনে করেন। এই নিউজটি চোখে পড়ার সাথে সাথেই ক্যাডার কর্মকর্তারা ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। অনেকেই শিক্ষাপত্রিকার সাথে কথা বলে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের একমাত্র প্ল্যাটফর্ম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির পক্ষ থেকে একটি উপযুক্ত বিবৃতি সবাই আশা করছিলেন। কারণ এই সমিতিই হচ্ছে কথা বলার জায়গা। ১৬ হাজার ক্যাডার কর্মকর্তার মুখপত্র হিসেবে একমাত্র সমিতিই এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথার জবাব দিতে পারে বলে ক্যাডার কর্মকর্তারা মনে করেন। তারই প্রেক্ষিতে সমিতির সদস্য সচিব মো: শাহেদুল খবির চৌধুরী স্বাক্ষরিত একটি প্রতিবাদপত্র  শিক্ষাপত্রিকার হাতে এসেছে।   

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির প্যাডে ২৮ অক্টোবর ২০২১ খ্রি. তারিখে স্বাক্ষরিত প্রতিবাদপত্রে ১৬ হাজার ক্যাডার সদস্যের বক্তব্য প্রতিফলিত হয়েছে বলে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা মনে করেন। প্রতিবাদপত্রে বলা হয়েছে, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিবের বক্তব্যে ১৬০০০ বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তার মেধা, মর্যাদা এবং অধিকারকে অসম্মান করা হয়েছে। এ জাতীয় বক্তব্য প্রদান অনভিপ্রেত ও বিদ্বেষপ্রসূত যা ক্যাডারের স্থিতিশীলতার জন্য হানিকর। প্রতিবাদপত্রে আরও বলা হয় কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিবের এ বক্তব্য বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়কার শিক্ষা ক্যাডার বিদ্বেষী শিক্ষা সচিব শহীদুল আলমের কর্মকাণ্ডের সাথে মিলে যায়। সে সময় থেকেই মূলত: শিক্ষা ক্যডারের প্রশাসনিক পদসমূহ গ্রাস করার সর্বাত্মক অপচেষ্টা শুরু হয়। প্রাথমিক শিক্ষার প্রশাসনিক পদ দখল, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্পে শিক্ষা ক্যাডার বহির্ভূতদের পদায়ন, নায়েম থেকে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের বিতাড়নের অপচেষ্টা এ সবই ঘটেছিল সে সময়। তারই ধারাবাহিকতায় এখনও মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পদে আসীন কেহ কেহ এরূপ অভিপ্রায় নিয়ে কাজ করছেন। 

প্রতিবাদপত্রে আরও বলা হয়, মনে রাখতে হবে শিক্ষা প্রশাসন থেকে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের সরিয়ে ঐ সকল পদ দখল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উন্নয়ন দর্শনের পরিপন্থী। জাতির পিতার উন্নয়ন দর্শনের মূলে ছিল স্ব স্ব পেশায় দক্ষ পেশাজীবীদের কাজে লাগানো। সেজন্য তিনি প্রশাসনিক বিন্যাসে বিশেষায়ন নীতি গ্রহণ করেছিলেন। রাষ্ট্রের সামষ্টিক সমৃদ্ধি ও অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে এটি নি:সন্দেহে অপরিহার্য ও অবিকল্প কৌশলের অংশ। জাতির পিতা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ড. এ আর মল্লিক ও অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে শিক্ষা সচিব পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এছাড়া স্বাস্থ্য, প্রকৌশলসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে স্ব স্ব পেশায় দক্ষদের সচিব পদে পদায়ন করেছিলেন। পরবর্তীতে সিভিল সার্ভিসের জন্য বিভিন্ন পেশার গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়েই বিভিন্ন ক্যাডার গঠন করা হয়েছে। 

আরও পড়ুন: মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা সচিবের বক্তব্যের জোরালো প্রতিবাদ শিক্ষা ক্যাডার ও সমিতির নেতৃবৃন্দের

আন্ত:ক্যাডার বৈষম্য কমিয়ে আনার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুষ্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বিশেষায়িত ক্যাডারসমূহের পদে বিশেষ একটি ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অন্যায্য পদায়ন ও পদায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন পেশাজীবী ক্যাডারের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতে জনগণের সর্বোচ্চ সেবা পাবার অধিকার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিবাদপত্রে আরও বলা হয়, বিভিন্ন দপ্তর অধিদপ্তরের মূল পদগুলোতে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদ সংকোচন করে একটি বিশেষ ক্যাডার এবং নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদায়নের সুযোগ রেখে নতুন নতুন নিয়োগ বিধিমালা তৈরি করা হচ্ছে। অনেকগুলো দপ্তরেই ডি-ক্যাডারাইজেশনের অপচেষ্টা চলছে। কিছু কিছু জায়গায় আংশিকভাবে এসব বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রাথমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দপ্তর-অধিদপ্তরগুলো থেকে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দপ্তর- অধিদপ্তরগুলোতেও এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। 

প্রতিবাদপত্রে আরও বলা হয়, 'কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব জনাব আমিনুল ইসলাম খানের বিভিন্ন পদক্ষেপ এবং সাম্প্রতিক বক্তব্য বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের স্বার্থবিরোধী এবং বর্তমান সরকারকে বিব্রত করার এক সুপরিকল্পিত অভিপ্রায়ের অংশ।'

কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিবকে শিক্ষা ক্যাডার বিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য বলা হয় প্রতিবাদপত্রে। সদস্য সচিব প্রতিবাদপত্রের সর্বশেষে কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিবের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করার পাশাপাশি বক্তব্য প্রত্যাহার করা এবং শিক্ষা ক্যাডার ও শিক্ষা পরিপন্থী কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোরভাবে আহ্বান জানান। 

প্রতিবাদপত্রটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সংশ্লিষ্ট পত্রিকায় প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ফেসবুক গ্রুপগুলোতে প্রতিবাদপত্র প্রকাশের পর সমর্থনের বন্যা বয়ে চলেছে। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা এরকম একটি প্রতিবাদপত্রের মাধ্যমে একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের উপযুক্ত জবাব বলে মন্তব্য করেছেন। শিক্ষা ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা মন্তব্যে লিখেন ' ২৫ বছরের চাকুরি জীবনে তথা চাকুরি থেকে অবসর নেয়ার প্রাক্কালে এই প্রথম কোনও যৌক্তিক এবং মেরুদণ্ডী প্রতিবাদ প্রত্যক্ষ করলাম। উল্লেখ্য, শক্তিধর 'হাতি'দল তাদের মিলিতশক্তি সম্পর্কে অসচেতন বলেই একজনমাত্র 'মাহুত' নাকে দড়ি লাগিয়ে ঘোরাতে সমর্থ হয় এবং বিনাবাধার কারণে ক্রমেক্রমে অতি-আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠে! মন্তব্যের শেষে তিনি লিখেন, ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড, ডিভাইডেড উই ফল।'

 আরেকজন ক্যাডার সদস্য লিখেছেন, 'ধন্যবাদ জনাব শাহেদুল খবির চৌধুরী স্যার। এমন ঠান্ডা মাথায়, নরম কিন্তু যৌক্তিক ভাষায় থোতামুখ ভোঁতা করা বিবৃতি দেবার জন্য। এই প্রক্রিয়ায় ১৬ হাজার ক্যাডার সদস্য আপনার পিছনে সদা জাগ্রত।' একজন নবীন ক্যাডার সদস্য লিখেছেন, 'এই একজন আছেন যিনি প্রকৃতপক্ষেই বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের জন্য নিবেদিত সর্বদাই। কৃতজ্ঞতা শ্রদ্ধেয় শাহেদ স্যার। অকৃত্রিম শ্রদ্ধা আপনারই জন্য।' আরেকজন ক্যাডার সদস্য লিখেছেন, 'অন্যায়ের প্রতিবাদ না হলে ক্যাডারের অস্তিত্ব হুমকির সম্মুখীন হবে। স্যার, অধিকার আদায়ের প্রশ্নে সমিতির পক্ষ থেকে আপনার এই প্রতিবাদ সময়োপযোগী এবং শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য হিসেবে স্বাগত জানাই।'

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির একজন নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তা শিক্ষাপত্রিকাকে বলেন, শিক্ষা ক্যাডারের প্রাণের সংগঠন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি। এই সমিতিতে বর্তমানে যারা নেতৃত্বে আছেন তাদের প্রতি আস্থা রেখেছেন ১৬০০০ ক্যাডার সদস্য। একজন বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী, প্রগতিশীল, নির্মোহ, নির্লোভ ক্যাডারবান্ধব হিসেবে সমিতির বর্তমান সদস্যসচিব মো: শাহেদুল খবির চৌধুরী বর্তমানে এই সমিতির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার নেতৃত্বেই আত্তীকরণ বিধি ২০১৮ বাস্তবায়িত হয়েছে যা ষোলো হাজার ক্যাডার সদস্যকে সুরক্ষিত করেছে।  সদস্য সচিবের এই সাহসী বক্তব্য আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছে। এখন থেকে আর কোনো ছাড় নয়। শিক্ষা ক্যাডারের হিস্যা বুঝে নিয়েই আমরা তরুণ ক্যাডারদের হাতে নিরাপদ শিক্ষা ক্যাডার রেখে যাবো। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ায় শিক্ষা ক্যাডারকে নিবেদিত করতে এর বিকল্প নেই । 'ক্যাডার যার মন্ত্রণালয় তার' এই নীতিতে কৃত্য পেশাভিত্তিক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার দাবি আজ থেকে শুরু হলো। এজন্য তিনি সমিতির সকল সদস্যকে সদস্যসচিবের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। 

  

শিক্ষা সংক্রান্ত সর্বশেষ খবর এবং শিক্ষা ক্যাডারের সকল খবর জানতে শিক্ষাপত্রিকার ফেসবুক পেজে লাইক করুন।


এ জাতীয় আরো খবর