বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

১৫ আগস্ট : আঁধারের পথে যাত্রা

  • মোহাম্মদ আবদুল হালিম
  • ২০২১-০৮-১৪ ১৩:১৭:৫৩
image

এই তো কদিন আগে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে খুব আক্ষেপ করে বলছিলেন, যে জাতির জন্য নিজের সুখ, শান্তি বিলিয়ে দিয়ে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন জাতির জনক; সেই বাঙালিই কেন তাকে নির্মমভাবে স্বপরিবারের হত্যা করল?

আদতে এই প্রশ্ন তো শুধু বঙ্গবন্ধু কন্যারই নয়, কোটি মানুষের।

শুধু এটিই নয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর জন্ম নেওয়া অনেক প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। তবে নির্মম সেই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের যে অন্ধকারের পথে যাত্রা শুরু হয়েছিল তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ১৫ আগস্টের খুনিদের বাঁচাতে কুখ্যাত ইমডেনিটি অধ্যাদেশ জারি, খুনিদের পুনর্বাসিত করা, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া- এই সবই সেই অন্ধকার পথের এক একটি মাইলফলক।

যে খন্দকার মোশতাক আহমেদ ছিলেন কাছের মানুষ, তার সঙ্গেই ষড়যন্ত্রের জাল তৈরি করে জাতির জনককে হত্যার ছক কষেছিল একদল সেনা কর্মকর্তা। অত্যন্ত মর্মন্তিক ঘটনার জন্ম দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পরিবারের মাত্র দুজন সদস্য বাদে সবার প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই ঘৃণ্য, সেই হত্যাকাণ্ডের পর পরই জাতির জনকের রক্তের ওপর দিয়ে মোশতাক নিজেই প্রেসিডেন্ট হয়ে বসেন। যেন নিজেই নিজেকে করলেন পুরস্কৃত।

এই ধারাবাহিকতা থেকে বাদ যায়নি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া ১২ সেনা কর্মকর্তাও। রাতারাতি তাদেরকে মেজর পদে উন্নীত করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। এক লাফে সেনাপ্রধানের চেয়ারে বসে যান তিনি।

মোশতাকের আরেকটি ঘৃণ্য কাজ হচ্ছে ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি। যার মাধ্যমে ঠাণ্ডা এই খুনিদের তিনি শুধু সুরক্ষাই দেননি, হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথও রুদ্ধ করে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ঘটানোর পরও খুনিদের নিরাপদে ভাড়া করা বিমানে থাইল্যান্ড যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। সেখান থেকে লিবিয়া।

বঙ্গবন্ধুর পর পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর জাতির জনকের চার ঘনিষ্ঠ সহচরকে কারাপ্রকোষ্ঠে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পরই মূলত ‘কিলার মেজরদের’ রক্ষার পথ তৈরি করেছিলেন মোশতাক।

মোশতাকের পর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের অভাবনীয়ভাবে পুরস্কৃত করেছিলেন ১৫ আগস্টের অন্যতম সুবিধাভোগী জিয়া। পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে দেশের ক্ষমতায় আসা সামরিক শাসক জিয়া জাতির জনকের কয়েকজন খুনিকে বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে কূটনীতিকের চাকরি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেন। জাতির জনকের হত্যাকারীরা সেই দেশেরই প্রতিনিধিত্ব করবে বিদেশে, ভাবা যায়? কয়েকজনকে যুক্ত করা হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও।

পরে জেনারেল জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন আরেক সামরিক শাসক জেনারেল এইচএম এরশাদ এবং খালেদা জিয়ার নির্বাচিত সরকার। ‘খুনি মেজররা’ এই দুই শাসকের সব মেয়াদেই ভোগ করেছে যাবতীয় সরকারি সুযোগ সুবিধা।

শেখ মুজিবর রহমানকে হত্যার পুরস্কার হিসেবে কূটনীতিকের চাকরি পেয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল শরিফুল হক ডালিম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবদুল আজিজ পাশা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর বজলুল হুদা, লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ চৌধুরী, লেফটেন্যান্ট কর্নেল নূর চৌধুরী, মেজর আহমেদ শরিফুল হোসেন, ক্যাপ্টেন কিসমত হাশেম, লেফটেন্যান্ট খায়রুজ্জামান (পরে মেজর), লেফটেন্যান্ট আবদুল মাজেদ (পরে ক্যাপ্টেন)।

প্রথম কূটনীতিক হিসেবে চাকরি হয় লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডালিমের, পিকিংয়ে (বর্তমানে বেইজিং)। পরে তাকে হংকংয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে কনসাল জেনারেল করা হয়। লিবিয়ার ত্রিপোলিতেও বাংলাদেশ মিশনে কাজ করেন ডালিম। ধাপে ধাপে পদোন্নতি দিয়ে তাকে রাষ্ট্রদূতও করা হয়। সবশেষ তিনি ছিলেন নাইরোবিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনার।

১৯৮০ সালের ১৭ জুন এই ডালিমই আবার লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাহরিয়ারের সঙ্গে মিলে জিয়াকে উৎখাত করতে অভ্যুত্থানে জড়িত ছিলেন। ওই ঘটনার পর দুজনই গ্রেপ্তারের ভয়ে নিজ নিজ মিশন থেকে পালিয়ে যান। জিয়া প্রশাসনের সঙ্গে আপসরফা করে চাকরিতে ফেরেন তারা। আশির ওই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর চীন থেকে লন্ডনে পালিয়ে যাওয়া ডালিম চাকরি ফিরে হংকং মিশনে নিয়োগও পান।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল রাশেদ চৌধুরী ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত নাইজেরিয়ায় কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তার শেষ পোস্টিং ছিল টোকিওতে চ্যান্সারির প্রধান এবং কাউন্সিলর হিসেবে। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ সরকার তাকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেয়। রিসালদার মোসলেম উদ্দিনকে তেহরান ও জেদ্দায় এবং ক্যাপ্টেন কিসমত হাশেম অটোয়ায়, লেফটেন্যান্ট আব্দুল মাজেদ ত্রিপোলিতে চাকরি পান।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজিজ পাশা রোমে বাংলাদেশ মিশনের প্রথম সচিব হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৮০ সালের ১৭ জুনের অভ্যুত্থানে সম্পৃক্ততার কারণে আজিজ পাশাকে ঢাকায় গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল। কিন্তু তিনিও অভ্যুত্থান সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়ার শর্তে জিয়ার সঙ্গে সমঝোতা করে নেন। তাকে আবারও রোমে কাউন্সিলর করা হয়। আজিজ পাশা নাইরোবিতেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

আজিজ পাশা সবশেষ ডেপুটি হাই কমিশনার ছিলেন জিম্বাবুয়েতে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেয়। সেখানে ২০০১ সালে মারা যান পাশা। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্যি, ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল দেখিয়ে তার পরিবারকে অবসর-পরবর্তী সকল সুবিধা দেওয়ার রাস্তা করে দেয়।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ একুশ বছর পর ১৯৯৬ সালে তার কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ইনডেমনিটি আইন বাতিলের মাধ্যমে খুনিদের বিচারের পথ খুলেছিলেন। কিন্তু ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে এবং বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতা গ্রহণ করলে সেই পথ আবারও রুদ্ধ হয়ে যায়।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সেই পথ ফের উন্মুক্ত হয় ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের পর বঙ্গবন্ধুর ১২ খুনির পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি। আজিজ পাশা তো আগেই মারা যান জিম্বাবুয়েতে। সবশেষ ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদকে গ্রেপ্তারের পর তার সাজা কর্যকর করা হয়।

এখনো পলাতক চারজন। এরা হলেন- খন্দকার আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, নূর চৌধুরী, রাশেদ চৌধুরী এবং মোসলেম উদ্দিন খান। এদের মধ্যে নূর চৌধুরী টরন্টো এবং রাশেদ চৌধুরী লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু আইনি জটিলতায় তাদেরকে দেশে ফেরানো সম্ভব হয়নি আজও।

বিভিন্ন দেশে আত্মগোপনে থাকা বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফেরাতে সহযোগিতা চেয়ে ২০১০ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি সেসব দেশের সরকারগুলোকে চিঠিও দিয়েছিলেন। খুনি নূর চৌধুরী ও রাশেদ চৌধুরীকে বাংলাদেশ ফেরত পাঠাতে ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর যথাক্রমে কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন বেয়ার্ড ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকেও চিঠি দিয়েছিলেন দীপু মনি। কিন্তু কানাডার আইনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তিকে ফেরত পাঠানো যায় না, ফলে এই কারণ দেখিয়ে নূর চৌধুরীকেও হস্তান্তর করতে রাজি হয়নি দেশটি।

অন্যদিকে আইনি জটিলতা এবং আবাসন বিষয়ক একটি মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত পাঠাতে ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে তখনকার বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আকরামুল কাদের আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছিলেন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি হাউজ কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান কংগ্রেসম্যান পিটার কিংকে।

আরেক পলাতক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদের যুক্তরোষ্ট্রে বসবাসের একটি আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল ২০০৭ সালের ১৭ জুন। পরে বঙ্গবন্ধুর অন্য চার খুনির সঙ্গে মহিউদ্দিনকেও ২০১০ সালে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়।

বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা ষড়যন্ত্রের অন্যতম পরিকল্পনাকারী লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার আবদুর রশিদ প্রথমদিকে লিবিয়াতে নির্মাণ ব্যবসায় জড়িত হয়েছিলেন। সেখান থেকে ঘনঘন পাকিস্তানে যাতায়াতও করতেন। কিন্তু লিবিয়াতে গাদ্দাফির পতনের পর তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
আর পাকিস্তানে বসবাস করা ডালিম প্রায়ই ব্যবসার কাজে লিবিয়া ও নাইরোবি যান বলে তথ্য আছে।

মুক্তিযুদ্ধের অর্জন ও মূল্যবোধকে ধ্বংসের পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক চেতনা দমনের জন্যই যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটি একটি সময় কিংবা একটি দিনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং বাংলাদেশের ওপর বারবারই আঘাত এসেছে। শুধু বাংলাদেশের নাম আর পতাকাই পরিবর্তিত হয়নি, এ ছাড়া দেশটিকে পাকিস্তানের করদরাজ্যে পরিণত করার সব চেষ্টাই হয়েছে।

অনুতাপের বিষয় হচ্ছে, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত পতাকাকে অপমানিতও করা হয়েছে যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধীদের গাড়িতে ওড়ানোর সুযোগ করে দিয়ে।

মোহাম্মদ আবদুল হালিম: গণমাধ্যমকর্মী, মোবাইল : ০১৮৪৭২২৬৪৯৪, ইমেইল: [email protected], ফেসবুক: https://www.facebook.com/halim.sumon.7


এ জাতীয় আরো খবর