বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

ক্রিপ্টোকারেন্সি বৈধতার বিষয়ে সরকারের দ্রুত ভাবা উচিত

  • স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
  • ২০২১-০৭-২৭ ২০:৫৯:৪৬
image

ক্রিপ্টোকারেন্সি এক ধরনের সাংকেতিক মুদ্রা যার কোন বাস্তব রূপ নেই। এর অস্তিত্ব শুধু ইন্টারনেট জগতেই আছে। এটি ব্যবহার করে লেনদেন শুধু অনলাইনেই সম্ভব যার পুরো কার্যক্রম ক্রিপ্টগ্রাফি নামক একটি সুরক্ষিত প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়। ২০১৭ সাল থেকে এটি একটি উঠতি মার্কেটে পরিণত হয়েছে। 

বিবরণ ক্রিপ্টোকারেন্সি এক ধরনের পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থা। এতে তৃতীয় পক্ষের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তাই কে কার কাছে এই ডিজিটাল মুদ্রা বিনিময় করছে তা অন্য কেউ জানতে পারে না। আবার পরিচয় গোপন রেখেও এটা দিয়ে লেনদেন করা যায়। তবে এর এনক্রিপটেড লেজার সব লেনদেনকে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়া থেকে নিয়ন্ত্রণ করে। ক্রিপ্টোকারেন্সির ভ্যালুর উপর কোন দেশের সরকারেই হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা নেই। তাই পৃথিবীর অনেক দেশেই এ ডিজিটাল মুদ্রার উপর সে দেশের সরকারের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

উদাহরণ সাধারণভাবে আমরা যখন কারো কাছে টাকা পাঠাই, তখন ব্যাংকএর সাহায্য নিই। আবার যদি ব্যাংক খোলা না থাকে মোবাইল ব্যাংকিং(বিকাশ, রকেট, ইউক্যাশ,নগদ) বা অনেক ক্ষেত্রে কুরিয়ার ও পোষ্ট অফিসের মধ্যদিয়েও পাঠাই। এ প্রক্রিয়া সম্পন্নের জন্য সার্ভিস চার্জ আদায় করে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সিতে যেহেতু তৃতীয় পক্ষের কোন প্রয়োজন হয় না। তাই এর কোন বাড়তি চার্জও নেই। তবে সর্বনিম্ন চার্জ রয়েছে।

আরো সহজে বোঝাতে চাইলে বলা যায় অ্যাপ ভিত্তিক কিছু সার্ভিসের কথা। অনেক সময় মোবাইলে মাই জিপি, মাই রবি বা ডিংটন, ক্যাম স্ক্যান ব্যবহার করা হয়। এগুলোর মাধ্যমে রিচার্জ করলে পয়েন্ট আসে। পরে সেগুলো দিয়ে ডাটা কেনা যায়। আর বিজ্ঞাপন দেখেও পয়েন্ট পাওয়া যায়। পরে সেই পয়েন্ট ব্যবহার করে কথা বলা ও ক্লাউড স্পেস পাওয়া যায়।

ক্রিপ্টোকারেন্সির তালিকা সারা পৃথিবীতে প্রায় হাজারেরও উপরে সাংকেতিক মুদ্রা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে • বিটকয়েন • ইথেরিয়াম • লাইটকয়েন • রিপল • মোনেরো • ড্যাশ • বাইটকয়েন • ডোজকয়েন ইত্যাদি। তবে এগুলোর মধ্যে বিটকয়েন সবার পূর্বসূরি ও সবচেয়ে পরিচিত। মূলত এর সফলতার কারণেই আরো প্রতিদ্বন্দ্বী কারেন্সির জন্ম হয়।

ইতিহাস ১৯৮৩ সালে আমেরিকান ক্রিপ্টোগ্রাফার ডেভিড চৌম ক্রিপ্টোগ্রাফিক পদ্ধতিতে ডিজিটাল উপায়ে টাকা আদান প্রদানের বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেন। যার নাম দেন ই-ক্যাশ। ১৯৯৫ সালে, তিনি ডিজিক্যাশের মাধ্যমে একটি ক্রিপ্টোগ্রাফিক ইলেকট্রনিক পেমেন্টের প্রাথমিক ফর্ম বাস্তবায়নের দিকে এগুতে থাকেন। পরবর্তীতে সফটওয়ারে নির্দিষ্ট এনক্রিপটেড কীগুলি ইনপুটের পর প্রাপক প্রেরণকারীর অর্থ পান। তবে এই অর্থ কোন রাষ্ট্রে পরিচালিত মুদ্রা (টাকা, ডলার, পাউন্ড, দিনার) এর মত নয়। সম্পূর্ণ অস্থিত্বহীন পয়েন্ট। তবে সাতশি নাকামোতো (কোন ব্যক্তি বা গ্রুপ) সফলভাবে কেন্দ্রীয় সত্তা বিহীন ডিজিটাল ক্যাশ পেমেন্ট চালু করেন। যা বিটকয়েন নামে পরিচিত।

পদ্ধতি ক্রিপ্টোকারেন্সি যেহেতু অস্তিত্বহীন মুদ্রা। পিয়ার টু পিয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রেরক থেকে সরাসরি প্রাপকের কাছে যায়। সেহেতু এর বিনিময় পদ্ধতিও আলাদা।

ওয়ালেট ওয়ালেট অনলাইন মানিব্যাগ। যা অনলাইন ও অফলাইন, এই দুই ধরনের হয়। এই ওয়ালেট থেকে প্রেরণকারী অর্থ পাঠাতে পারে। আর গ্রহণকারী নিজের ওয়ালেটে ভরতে পারে। প্রতিটি ওয়ালেটের এক একটি নির্দিষ্ট এনক্রিপ্টেড ঠিকানা থাকে। ব্লকচেইন এক ঠিকানা থেকে অন্য ঠিকানায় ক্রিপ্টোকারেন্সি পাঠাতে তা এনক্রিপটেড লেজার বা উন্মুক্ত খতিয়ানে রেকর্ড হয়ে যায়। যাকে ব্লকচেইন বলে। এখানে জমা থাকা তথ্য পৃথিবীর যে কোন স্থান থেকে দেখা সম্ভব।

মাইনিং ব্লকচেইনে লিপিবদ্ধ প্রতিটি লেনদেনের বৈধতা নির্ণয়করণকে বলা হয় মাইনিং। আর এ কাজ যারা করেন তাদেরকে বলা হয় মাইনার। ফলে কোন ধরনের প্রতারণার সম্ভাবনা থাকে না। পরিচয় গোপন থাকে উভয় পক্ষেরই।

বৈশিষ্ট্য লেনদেনের দ্রুততম প্রক্রিয়া। প্রত্যেক ব্যবহারকারী তার ডিজিটাল মুদ্রার মালিক। অন্য কেউ তার মালিকানা নিতে পারবে না। একজন ব্যবহারকারী কয়েকটি একাউন্ট খুলতে পারেন। এসবের জন্য নাম, ঠিকানা বা ব্যক্তিগত তথ্যের প্রয়োজন হয় না। ব্লকচেইনে জমা থাকা লেনদেনের তথ্য পৃথিবীর যেকোন জায়গা থেকে দেখা যাওয়ায় দুর্নীতির সুযোগ নেই। এটি সম্পূর্ণ অফেরতযোগ্য। ভুল ঠিকানা থেকে আর ফেরত পাওয়া যায় না।

প্রচার বিট কয়েন এটিএম। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে রোবোকয়েনের প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বিটকয়েনের এটিএম বুথ খোলেন। অস্টিন ও টেক্সাসেও এরকম একটি এটিএম বুথ আছে কিন্তু এর স্ক্যানার পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স পড়তে পারে। সেপ্টেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত সারা বিশ্বে ১৫৭৪টি বিটকয়েন এটিএম স্থাপন করা হয়।

জনপ্রিয়তা বিশ্বের বহুদেশে অনলাইন বিকিকিনির জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি বেশ জনপ্রিয়। উইকিপিডিয়া, ওয়ার্ডপ্রেস, মাইক্রোসফটের মত প্রায় ৩০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান ক্রিপ্টোকারেন্সি গ্রহণ করে।

মূল্য ক্রিপ্টোকারেন্সির মূল্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। এত মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ হিসেব বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এটি মাইনিং করার জন্য শক্তিশালী কম্পিউটার ও সার্ভার প্রয়োজন। রয়েছে বিদ্যুৎ খরচ।

এশিয়ায় প্রবেশ ২০১৪ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে বিট কয়েন ফাউন্ডেশনে যুক্ত হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার বিট কয়েনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু কারণ।

অপব্যবহার ক্রিপ্টোকারেন্সি সংরক্ষণের জন্য কোন সংরক্ষণাগার নেই। তাই ব্যাকআপ না থাকলে কম্পিউটার ক্রাশের মাধ্যমে মুছে যেতে পারে তথ্য উপাত্ত। হ্যাকিং ও ম্যালওয়্যার আক্রমণের হুমকিও রয়েছে। রয়েছে ডিজিটাল অর্থ চুরির আশংকাও। ৩৪ বছরের ইতিহাসে এ পর্যন্ত ৪০টিরও বেশি চুরির শিকার হয়েছে বিটকয়েন।

ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন অপরাধ নয়, সিআইডিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠি

ক্রিপ্টোকারেন্সির মালিকানা, সংরক্ষণ বা লেনদেন অপরাধ নয় বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) পাঠানো এক চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ এ মতামত দিয়েছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি একধরনের ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা। ইন্টারনেটের মাধ্যমে লেনদেন হওয়া এ ধরনের মুদ্রার সংখ্যা এখন আট হাজারের বেশি। তবে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় বিটকয়েন।

কয়েন মার্কেট ক্যাপের তথ্য অনুযায়ী, ১ বিটকয়েনের বিনিময়মূল্য গত ২৪ জুলাই সন্ধ্যায় ছিল ৩৩ হাজার ৮০৫ দশমিক ৩১ ডলার। তবে বাংলাদেশে বিটকয়েন লেনদেন অপরাধ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এ মুহূর্তে সিআইডি দুটি মামলার তদন্ত করছে। এমন একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি মতামত চেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। গত ১৮ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের সহকারী পরিচালক শফিউল আজম ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে ব্যাংকের অবস্থান জানান সিআইডিকে। তিনি লেখেন, ক্রিপ্টোকারেন্সির মালিকানা, সংরক্ষণ বা লেনদেন স্বীকৃত না হলেও এটিকে অপরাধ বলার সুযোগ নেই মর্মে প্রতীয়মান হয়। ওই চিঠিতে তিনি আরও বলেন, ভার্চ্যুয়াল মুদ্রায় লেনদেনের ফলাফল হিসেবে দ্বিতীয় পর্যায়ে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৪৭; সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর আওতায় অপরাধ হতে পারে। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সিআইডি এ নিয়ে অনুসন্ধান করে দেখতে পারে।

একই চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বর্তমান বিশ্বে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রার বাজার দুই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রচলনের প্রাথমিক পর্যায়ে বিশ্বের কোনো আইনগত কর্তৃপক্ষ এই মুদ্রাকে স্বীকৃতি দেয়নি। কিন্তু বর্তমানে কয়েকটি দেশের (যেমন: জাপান, সিঙ্গাপুর, আরব আমিরাত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) কেন্দ্রীয় ব্যাংক/মুদ্রা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেনকে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যন্ত ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো এ ধরনের প্রাইভেট কারেন্সিতে লেনদেন বা সংরক্ষণের অনুমোদন দেয়নি।

২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে কৃত্রিম মুদ্রায় (যেমন বিটকয়েন) লেনদেন থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করেছিল। বিজ্ঞপ্তিতে ওই সময় বাংলাদেশ ব্যাংক বলে, ভার্চ্যুয়াল মুদ্রায় লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সম্পর্কিত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। ক্রিপ্টোকারেন্সির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এখনো কোনো নীতিমালা প্রণয়ন করেনি। তবে এর মধ্যেই ক্রিপ্টোকারেন্সিকে একেবারে নাকচ করে না দেওয়ার ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে সংস্থাগুলোর মধ্যে।

যেমন, সরকারের ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি ডিভিশন। ২০২০ সালের মার্চে এ বিভাগ ন্যাশনাল ব্লকচেইন স্ট্র্যাটেজি করে। ওই কৌশলপত্রে তারা বলেছে, ব্লকচেইন স্টার্টআপে ২০১৩ সাল থেকে ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ হয়েছে। এই বিনিয়োগ ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। বাংলাদেশি সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিগুলোর জন্য এটা একটা সুযোগ। কিন্তু ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকায় বাংলাদেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি এ আকর্ষণীয় সুযোগের বাইরে থেকে যাচ্ছে। অবশ্য ওই কৌশলপত্রে এও বলা হয়েছে, উপযুক্ত প্রযুক্তি, আইন ও নীতি কাঠামোর অনুপস্থিতিতে এ ধরনের ডোমেইন দেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের পথকে উন্মুক্ত করে দিতে পারে। তাই এই উভয়সংকট কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তা বিবেচনা করা উচিত।

ব্লকচেইন হলো তথ্য সংরক্ষণের পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে বিভিন্ন ব্লকে একটির পর একটি তথ্য চেইনের মতো করে সংরক্ষণ করা হয়। ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেনের তথ্য ব্লকচেইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে। এমনিতে এই মুদ্রার লেনদেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিতে থাকে না। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী দুজন নিজেদের পরিচয় প্রকাশ না করে সরাসরি এই লেনদেন করে । ২৭ থেকে ৩৪ অক্ষরের একটি আইডি খুলে ইন্টারনেটে অ্যাকাউন্ট খুলে এই মুদ্রা লেনদেন করা যায়। ভার্চ্যুয়াল এই মুদ্রা জমা থাকে ডিজিটাল ওয়ালেটে। যদিও আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, শিগগির বিটকয়েন অনুমোদন দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বিটকয়েনের ভালো-মন্দ খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সিআইডিতে তদন্তাধীন দুই মামলা অভিযোগ একই

এ মুহূর্তে সিআইডি দুটি মামলার তদন্ত করছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে র্যাব-১ মো. রায়হান হোসেন ওরফে রায়হানকে গ্রেপ্তার করে। র্যাবের দাবি ছিল বাংলাদেশে বিট কয়েন প্রতারণা চক্রের মূল হোতা রায়হান। এক মাসে তিনি ৩৫ হাজার মার্কিন ডলার লেনদেন করেছেন। অডি গাড়ি কিনেছেন ১ কোটি ৭ লাখ টাকা দিয়ে। তাঁর কাছ থেকে ১৯টি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র, ২২টি সিমকার্ড, ২৫ ডলারসহ ১ হাজার ২৭৫ টাকা, একটি কম্পিউটার, ৩টি সেলফোন, ৩টি ভুয়া চালান বই, একটি ট্রেড লাইসেন্স, একটি টিন সার্টিফিকেট, একটি রেকর্ডিং মাইক্রোফোন, একটি ক্যামেরা, একটি রাউটার, একটি হেডফোন, একটি মডেম ও বিভিন্ন ব্যাংকের চারটি চেকবই উদ্ধার করা হয়। র্যাবের অভিযোগ, রায়হান পাকিস্তানি নাগরিক সাইদের সহায়তায় বিটকয়েনের মাধ্যমে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তিনি পাকিস্তান, নাইজেরিয়া ও রাশিয়ার চোরাকারবারি, ক্রেডিট কার্ড হ্যাকার ও বিটকয়েনের মাধ্যমে অবৈধ পাচারকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন।

প্রায় একই ধরনের অভিযোগ তোলা হয় ইসমাইল হোসেন ওরফে সুমনের বিরুদ্ধে। গত ২ মে রাতে বাড্ডার ইকবাল ভিলা থেকে ইসমাইলকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরদিন সংবাদ সম্মেলনে র্যাব জানায়, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া ও রাশিয়ার ক্রেডিট কার্ড হ্যাকারদের সঙ্গে ইসমাইলের যোগাযোগ ছিল। তিনি বিদেশি সব হ্যাকারের সঙ্গে জোট বেঁধে প্রতারণা করে আসছিলেন। তারা আরও জানায়, ইসমাইল শিশুদের খেলনা ও কাপড়ের ব্যবসা করতেন একসময়। পরে বেসিক বিজ মার্কেটিং নামের একটি আউটসোর্সিং কোম্পানি তৈরি করেন। এর আড়ালে অবৈধ বিটকয়েন লেনদেন এবং অনলাইনে বিভিন্নভাবে প্রতারণা করে আসছিলেন। এভাবে তিনি অনেক সম্পদের মালিক হয়েছেন। ঢাকায় তাঁর দুটি ফ্ল্যাট, প্লট, সুপার শপের ব্যবসা আছে। এক বছরে তিনি অবৈধভাবে ১২ থেকে ১৫ লাখ ডলার লেনদেন করেন।

বাড্ডার ইসমাইল গ্রেপ্তারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ওঠে, বিটকয়েন লেনদেন হয় দুটি আইডির মধ্যে, এর বাইরে আর কারও এ সম্পর্কিত তথ্য জানতে পারার কথা নয়। তাহলে র্যাব তাঁদের প্রতারণার খবর কীভাবে নিশ্চিত হলো। এ বিষয়ে জানতে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কম্পিউটারে থাকা ডিজিটাল ওয়ালেট পরীক্ষা করে তাঁরা বিটকয়েন লেনদেনের ব্যাপারে তথ্য পান। তাঁদের মধ্যে ইসমাইল ইভ্যালি আদলে ব্যবসার চেষ্টা করছিলেন। তিনি দামি জিনিস কম টাকায় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজ্ঞাপন দিচ্ছিলেন। টাকাটা বিটকয়েনে নিয়ে সাইট বন্ধ করে দিচ্ছিলেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই বিটকয়েন এসেছিল বিদেশ থেকে। এখন পর্যন্ত বিটকয়েন লেনদেন ও প্রতারণার অভিযোগে র্যাব কমপক্ষে পাঁচটি অভিযান চালায়।

ক্রিপ্টোকারেন্সিকে নাকচ করা কঠিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, ক্রিপ্টোকারেন্সির লেনদেন অনেকেই করছেন। সবাইকে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। যাঁরা আউটসোর্সিংয়ের কাজ করেন, তাঁদের অনেক সময় সেবাগ্রহিতারা ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা দিয়ে থাকেন। এভাবে কেউ কেউ ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা লেনদেনে জড়িয়ে পড়ছেন। সিআইডির একটি সূত্র থেকে জানা যায়, ক্রিপ্টোকারেন্সি এখন একটি বাস্তবতা। বৈদ্যুতিক গাড়ির কোম্পানি টেসলার নির্বাহী পরিচালক ও বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক নিজেই বলেছেন, তাঁর কাছে ক্রিপ্টোকারেন্সি আছে। তিনি আরও বলেছেন, টেসলা এখন বিটকয়েন ব্যবহার করার কথা ভাবছে।

বাংলাদেশের উচিত, যেসব দেশ এই মুদ্রার অনুমোদন দিয়েছে, তাদের ঝুঁকি মোকাবিলার কৌশলগুলো পর্যালোচনা করে দ্রুত একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছানো। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ক্রিপ্টোকারেন্সিকে করের আওতায় এনে অনুমোদন দিয়েছে। একটাই সমস্যা ব্যবহারকারীদের পরিচয় প্রকাশ না পাওয়ায়, অপরাধের একটা সুযোগ থাকছে। এমনকি বাংলাদেশ থেকে অর্থ বিদেশে পাচারের ঘটনাও ঘটতে পারে। কীভাবে নিজেদের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে মেনে নেওয়া যায়, সে ব্যাপারে চিন্তা করা দরকার। তবে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) প্রধান নির্বাহী আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, ক্রিপ্টোকারেন্সিকে অনুমোদন দেওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়নি। ক্রিপ্টোকারেন্সির বিনিময় দুজনের মধ্যে হয়। নজরদারির কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের মতো দেশে এটিকে অনুমোদন দেওয়া হলে অর্থ পাচারকারীরা সুযোগ নিতে পারেন।


এ জাতীয় আরো খবর