শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮

জেফ বেজোসের কারমেন লাইন অতিক্রম: শীর্ষ ধনী শীর্ষ উচ্চতায়

  • স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
  • ২০২১-০৭-২১ ০০:৫০:১৬
image

বিজ্ঞানের জয়যাত্রা কল্পকাহিনীর সীমাকেও অতিক্রম করে ফেলেছে। আজ মানুষ মহাকাশে ঘুরতে যাচ্ছে যেখানে মানুষ আগে কল্পনায় ভেবে নিত। ভবিষ্যতে বিভিন্ন গ্রহ, নক্ষত্রে মানুষ ভ্রমণ করতে যাবে এ আর বিচিত্র কী! মহাকাশ ভ্রমণকে পর্যটনের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করাও এখন আর অবিশ্বাস্য কিছু নয়। মহকাশে যাওয়ার জন্য মঙ্গলবার (২০ জুলাই ২০২১) নিজের সংস্থার তৈরি রকেটে চড়ে মহাকাশে ঘুরে এলেন বর্তমানে এই পৃথিবী গ্রহের ধনীতম ব্যক্তি আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস। ৫২ বছর আগে এই দিনেই মানুষ প্রথম চাঁদের পা রেখেছিল। চন্দ্র বিজয়ের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই গতকালের এই দিনটিকে বেছে নেওয়া। মহাকাশ চর্চা বা মহাকাশ অভিযানের নিরিখে বেজোসের এই যাত্রা, মোটেই গুরুত্বপূর্ণ না হলেও, এই ধনকুবেরের মহাকাশ যাত্রা, অভিজাত পর্যটকদের মহাকাশে ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছাকে পূর্ণতা দেওয়ার এক নয়া শিল্প সম্ভাবনার নিরিখে অবশ্যই দারুণ গুরুত্বপূর্ণ এক মুহূর্ত বলে মনে করা হচ্ছে।

২০০০ সালেই এই দিনটির কথা ভেবেছিলেন জেফ বোজেস। স্থাপন করেছিলেন ব্লু অরিজিন সংস্থার। ২০১২ সাল থেকে সংস্থা তাদের নিউ শেপার্ড রকেটের ফ্লাইট টেস্ট শুরু করেছিল। আর মঙ্গলবার, ২০২১ সালের ২০ জুলাই, নিউ শেপার্ড রকেটের প্রথম ক্রু মিশন, অর্থাৎ মানব পরিবহণ সম্পন্ন হল। পশ্চিম টেক্সাস থেকে ১১ মিনিটে কার্মেন লাইন অর্থাৎ যেখানে বায়ুমণ্ডলের শেষ আর মহাকাশের শুরু সেই অংশ পেরিয়ে আবার ফিরে পৃথিবীতে ফিরে এলেন তাঁরা। প্রথমে ফিরে এল লঞ্চার অংশটি, তারপর চার নয়া নভোচরকে নিয়ে হেলেদুলে নামল ক্যাপসুলটি।

লিফট-অফ করার পরে, নিউ শেপার্ড রকেটটি একটি তরল হাইড্রোজেন-তরল অক্সিজেন ইঞ্জিন ব্যবহার করে প্রতি ঘন্টায় ৩৭০০ কি.মি. গতিবেগে উপরের দিকে ধাবিত হয়। একেবারে উপরে বসানো ছিল ক্য়াপসুলটি। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০৬ কিলোমিটার উচ্চতায় যাওয়ার পর ক্যাপসুলটি বুস্টার রকেটটি থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরপর তিন থেকে চার মিনিটের জন্য ক্যাপসুলটি মহাকাশে থেকেছে। বুস্টার তার লঞ্চ সাইটের ঠিক উত্তরে অবস্থিত একটি ল্যান্ডিং প্যাডে নিজে নিজেই ফিরে এসেছিল। ক্যাপসুলটির মরুভূমিতে নিরাপদ অবতরণের জন্য তিনটি বিশাল প্যারাসুট এবং একটি থ্রাস্টার ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে।

কেমন ছিল তাঁদের মহাকাশ দেখার অভিজ্ঞতা?

জেফ বেজোস, তার ভাই মার্ক বেজোস, পয়সা দিয়ে টিকিট কেটে মহাকাশে যাওয়া প্রথম পর্যটক ১৮ বছরের অলিভার ডিমেন ছাড়াও ক্যাপসুলে ছিলেন ৮২ বছর বয়সী মহিলা বিমান চালক ওয়ালি ফ্যাঙ্ক। কারমেন লাইন (Karman line) পেরিয়ে যাওয়ার পর তিনি অস্ফুটে বলে ওঠেন, 'উপরে এখানে অন্ধকার হয়ে গেছে'। আর্ন্তজাতিক অ্যারোনটিক্যাল ফেডারেশনে (FAI) পৃথিবী পৃষ্ঠের ১০০ কি. মি. উপরে অবস্থিত কারমেন লাইনকে  বায়ুমন্ডল এবং মহাশূন্যের মধ্যকার সীমা ধরে নেয়। এর বাইরের অংশকেই সাধারণত মহাশূন্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

গত ১১ জুলাই ধনকুবেরদের মহাকাশ যাত্রায় বোজেস'কে পিছনে ফেলে দিয়েছিলেন ভার্জিন গ্যালাকটিক সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রানসন। তবে তাঁর মহাকাশ যাত্রা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তাঁদের মহাকাশযান কারমেন লাইন না পার করায়, আদৌ তাঁর ভ্রমণকে মহাকাশ ভ্রমণ বলা যায় কি না, সেই বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদিক থেকে কিন্তু, ব্লু অরিজিন পিছনে ফেলে দিয়েছে ভার্জিন গ্যালাকটিককে। তাদের মহাকাশ যাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবে না কেউ। আর অনেকে এটিকে শীর্ষ ধনীর মহাকাশেও শীর্ষ অবস্থান বলে বিবেচনা করছেন।

ব্লু অরিজিন সংস্থাটি জানিয়েছে, এই বছর তাদের আরও দুটি ফ্লাইটের পরিকল্পনা আছে। তার পরের বছর আরও অনেকগুলি হবে। প্রথম উড়ানের সাফল্য এরপর তাদের রকেটের আরও অনেক যাত্রী এনে দেবে বলে আশা করছে তারা। তবে, যখন পৃথিবী জলবায়ু জনিত বিপর্যয় এবং করোনভাইরাস মহামারির মোকাবিলা করছে, তখন এই দুই ধনকুবেরের মহাশূন্যে পাড়ি দেওয়া নিয়ে সমালোচনাও কম হচ্ছে না।

যাত্রার খুঁটিনাটি

পশ্চিম টেক্সাসের একটি মরুময় উঁচু স্থান থেকে রওনা দিয়ে মাত্র ১০ মিনিট ২০ সেকেন্ডের এই মহাকাশ যাত্রা শুরু হয়। ভ্রমণ শেষে প্যারাসুটে করে তারা নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন।বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮৬ কিলোমিটার উচ্চতায় গিয়েছিল ব্র্যানসনের ভার্জিনের যান। কিন্তু বেজোসের ব্লু অরিজিনের 'নিউ শেপার্ড’ তার চেয়েও বেশি ১০০ কিলোমিটার উচ্চতা দিয়ে গেছে।  এর যাত্রীরা চার মিনিট মহাকাশে ভেসে থাকা এবং ওপর থেকে পৃথিবীকে দেখার অভিজ্ঞতা নিতে পেরেছেন। বিবিসি জানায়, যাত্রা করার দুই মিনিটের মাথায় রকেট থেকে ক্যাপসুলটি আলাদা হয়ে উপরের দিকে ক্যারম্যান লাইনে (পৃথিবী এবং মহাকাশের মধ্যকার সীমানা) যায়। তাছাড়া, বেজোসের এই মহাকাশযানে ছিল না কোনও পাইলট। স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটার প্রযুক্তিতে বিশ্বের এই শীর্ষ ধনকুবেরকে নিয়ে মহাকাশের পথে রওনা হয় রকেটটি।

তবে যাত্রার আগে ব্র্যানসন ও বেজোস দুইজনেই একই সুরে বলেছিলেন, এটি কোন প্রতিযোগিতা নয়। এনবিসি নেটওয়ার্ককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বেজোস বলেছিলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মহাকাশে অবিশ্বাস্য সব কীর্তি স্থাপনের পথ সুগম করে দিতেই তার এ যাত্রা। মহাকাশে যাওয়ার আগে বেজোস তার অনুভূতি জানিয়ে বলেছিলেন, তিনি উত্তেজনা বোধ করছেন, তবে উদ্বিগ্ন নন। আর যাত্রা শেষে ফেরার পর তিনি বলেন, “নভোচারী বেজোস: এর চেয়ে ভাল দিন আর হয় না।” শীর্ষ ধনীর মহাকাশের এই শীর্ষ উচ্চতায় ওঠার অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে মহাকাশ পর্যটনের দ্বার আরও খুলে দিবে বলে বোদ্ধাদের ধারণা। তখন সাধারণ মানুষও মহাকাশে কবে নাগাদ ভ্রমণে যেতে পারবেন তা সময়ই বলে দেবে।


এ জাতীয় আরো খবর