শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮

আন্তঃক্যাডার পদোন্নতি বৈষম্য নিরসন জরুরি

  • ড. নিয়াজ আহম্মেদ
  • ২০২১-০৭-১৬ ২১:২৬:০৯
image

বিসিএসের মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মেধাবীরা বিভিন্ন ক্যাডারে পদায়ন হয়ে জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। প্রার্থী যে পদে নিয়োগ পান না কেন তিনি দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন এটাই স্বাভাবিক। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকারদের চাকরির বাজার সংকুচিত হওয়ায় যারাই এখানে নিয়োগ পান ধরেই নেওয়া হয় তারা মেধাবী, মননশীল ও ধীশক্তি সম্পন্ন। এখন পর্যন্ত মোটাদাগে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়ায় কর্মকর্তা নির্বাচন করা হয় বিধায় সত্যিকার মেধাবীরা এখানে চাকরির সুযোগ পান। চাকরিপ্রত্যাশী ও অভিভাবকদের তাই বড় আস্থার জায়গা পিএসসি। বেতনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ক্রমান্বয়ে বাড়ার ফলে এক সময় কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বিসিএস বেশি পছন্দ হলেও বর্তমানে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের নিজেদের পেশাগত ক্যাডারের বাইরে অন্য ক্যাডারে ঝুঁকতে দেখা যাচ্ছে।

যে যে ক্যাডারে থাকুক না কেন প্রত্যেকের পদের বিপরীতে রয়েছে দায়িত্ব, কর্তব্য, কর্তৃত্ব, ক্ষমতা, নিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা। এ গুলো কোনো অংশেই এক ক্যাডার থেকে অন্য ক্যাডারে কম নয়। যদিও কাজের ধরন ও দায়িত্বের গুরুত্বের জন্য জবাদিহিতার জায়গাটি ক্যাডার থেকে ক্যাডারে কিছুটা ভিন্ন। প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের একজন সদস্যকে যতটা কঠিন দায়িত্ব ও জবাবদিহিতার আওতায় থাকতে হয় অন্য অনেক ক্যাডারে হয়তো তেমন নেই। আর তখনই প্রশ্ন আসে ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বিষয়। প্রশাসনে নির্বাহী আদেশ বাস্তবায়নের একটি বিষয় আছে। কাউকে না কাউকে এ আদেশ বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকতে হবে। ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রয়োগ না করতে পারলে প্রশাসন ভেঙে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে সরাসরি যুক্ত থাকতে হয় বিসিএস কর্মকর্তাদের; বিশেষ করে প্রশাসনসহ অন্যান্য বিশেষ কয়েকটি ক্যাডারের সদস্যদের। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার কাম্য নয়।

কাজের ধরনের জন্য বিশেষ কোনো ক্যাডারে লজিস্টিক সাপোর্ট অন্যদের চেয়ে বেশি সত্য এবং প্রয়োজনও বটে কিন্তু চাকরি জীবনে প্রমোশনসহ অন্যান্য আর্থিক সুবিধা সমান না হলে অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করে। সব ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রমোশন একই সময় হয় না বিধায় প্রশ্ন আসে বৈষম্যের। সবাই এখানে বিসিএস কর্মকর্তা। চূড়ান্ত ফলাফলে কারও মেধাক্রম আগে ছিল এবং পছন্দ বিধায় তিনি প্রথম সারির ক্যাডার পেয়েছেন। এটি সত্য যে- প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র কিংবা কাস্টমস প্রথম সারির ক্যাডার তা ক্ষমতা, কর্তৃত্ব কিংবা অন্য কোনো কারণেই হোক না কেন। তবে কে বড় আর কে ছোট তা এখানে বিবেচ্য বিষয় নয়। বড় বা ছোট কর্মগুণে, দায়িত্বশীলতা, কর্মনিষ্ঠা ও জবাবদিহিতায়। সবাই এ গুণগুলো সমানভাবে অর্জন করতে পারবে তা কিন্তু নয়। আমরা দেখি প্রশাসনের কোনো কোনো সদস্য সাধারণ মানুষের সেবক হয়ে কাজ করেন, কোনো কোনো চিকিৎসক নিরলস নিবেদিত প্রাণ হয়ে কাজ করেন আবার কোনো কোনো শিক্ষক ব্রত নিয়ে মানবসম্পদ তৈরি করেন। প্রত্যেকে আমরা পদের বিপরীতে থেকে যার যার দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করি।

যদি আমি শিক্ষা ক্যাডারে থাকি তাহলে আমার পরিচয় প্রথমত একজন শিক্ষক। তেমনি স্বাস্থ্য ক্যাডারে থাকলে একজন চিকিৎসক। নিজের ক্যাডারের প্রতি আন্তরিকতা যেমন থাকবে তেমনি অন্য ক্যাডারের সদস্যদের প্রতি মমত্ববোধও থাকতে হবে। আমরা যদি এভাবে ভাবি এবং নিজেদের ক্যাডারের অধিকার আদায় এবং সম্মান রক্ষায় কাজ করি তাহলে ক্যাডার মর্যাদা অক্ষণ্ণ থাকবে। আমাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা পরিচয় আছে কিন্তু বড় পরিচয় আমরা সবাই দেশের জন্য কাজ করছি। যিনি শিক্ষক তিনি যদি তার মেধা ও পড়াশোনা দিয়ে ভালোভাবে পাঠদান করান এবং তার শিক্ষার্থীরা পরবর্তী সময়ে বিসিএস কর্মকর্তা বনে যান এটাই তার সার্থকতা ও ক্ষমতা। তিনি ভালো শিক্ষক হলে তার কদর ও সম্মান অনেক বেড়ে যায়। যিনি চিকিৎসক তিনি মানুষের জীবন রক্ষা করেন। তার অবদানকে কোনোভাবেই খাটো করা ঠিক নয়। ক্ষমতা এক বিশেষ গুণ যার দ্বারা অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করা যায়। যদিও একজন শিক্ষক কিংবা চিকিৎসকের ক্ষমতা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়। নিজের কাজের মধ্য দিয়ে নিজেকে উপযুক্ত মনে করার মধ্যে ক্ষমতার সার্থকতা।

চাকরি জীবনে পদোন্নতি এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কাজে উৎসাহ পাওয়ার জন্য একটি বড় নিয়ামক। যথাসময়ে পদোন্নতি পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও সমাজের কাছে নিজের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ক্যাডার সার্ভিসে দেখা যায় কোনো কোনো ক্যাডারে দ্রুত পদোন্নতি আর অন্যদের বেলায় ধীরগতি। এ ছাড়া রয়েছে আবাসন ও গাড়ির প্রাধিকারসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়। সব ক্যাডারে পদোন্নতি একই সময় না হওয়ায় কোনো কোনো ক্যাডারের সদস্যদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। ধরে নেওয়া হয় তারা বৈষম্যের শিকার। পদোন্নতি সম্মানের একটি অংশ যা আর্থিক বিচারে মাপা হয় না। যথাসময়ে কারও পদোন্নতি না হলে দারুণ হতাশা কাজ করে। এ জন্য অনেকে ভালোভাবে কাজে মন দিতে পারেন না।

প্রসঙ্গক্রমে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের কথা এখানে উল্লেখ করতে চাই। শিক্ষা ক্যাডারে যেখানে ২২তম ব্যাচের পরের কর্মকর্তারা সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাননি, সেখানে প্রশাসন ক্যাডারের ২৭তম ব্যাচের কর্মকর্তারা উপসচিব পদে চাকরি করছেন এবং এর পরের ব্যাচের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা চলছে। একই অবস্থা বিরাজ করছে স্বাস্থ্য ক্যাডারেও। অথচ চাকরিতে তাদের অবদান কোনো অংশেই অন্য ক্যাডারের তুলনায় কম নয়, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেক বেশি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করছে। আমরা যদি সব ক্যাডারের সব কর্মকর্তাকে একটি অভিন্ন নীতিমালার মাধ্যমে পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে পারতাম তাহলে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য অনেক কমে আসত। পদ থাকুক বা না থাকুক নির্দিষ্ট সময় সবার প্রমোশন হওয়া উচিত। প্রয়োজনে পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতির ব্যবস্থা গ্রহণ করা চাই।

লেখক: ড. নিয়াজ আহম্মেদ, অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাবিপ্রবি

Email: [email protected]

 


এ জাতীয় আরো খবর