শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮

শুদ্ধাচার পুরস্কার পাওয়ায় শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ অভিভাবককে ফুলেল সংবর্ধনা

  • স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
  • ২০২১-০৬-১৭ ০২:৫২:৩৪
image

শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ অভিভাবক মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক শুদ্ধাচার পুরস্কারে ভূষিত হওয়ায় ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বইছে। গতকাল বুধবার (১৬/০৬/২০২১) বিকাল সাড়ে ৪ টায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সম্মেলনকক্ষে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মহাপরিচালকের এ অর্জনকে উদযাপন করা হয়। শিক্ষা অধিদপ্তরের সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্বত:স্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি খুবই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। মাউশির বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তাদের ফুলেল অভিষেকে সিক্ত হলেন  মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) প্রফেসর শাহেদুল খবির চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তারা মহাপরিচালকের এ অর্জনকে শিক্ষা পরিবারের অর্জন হিসেবে অভিহিত করেন। অধিদপ্তর প্রধান হিসেবে এ অর্জন কর্মকর্তা কর্মচারীদের দায়িত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বলে সবাই অভিমত ব্যক্ত করেন।

এর আগে বিকাল ৪ টা থেকেই মাউশি অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষের সামনে ভিড় করতে থাকেন কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ। অনেকের হাতেই ফুলের তোড়া। ঠিক সাড়ে ৪টায় পরিচালক প্রফেসর শাহেদুল খবির চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠান শুরু হয়। শুরুতে কর্মচারীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন কর্মচারী ইউনিয়নের সম্পাদক এবং সভাপতি। তারপর একে একে সহকারী পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন করে প্রতিনিধি মহাপরিচালকের এ অনন্য অর্জনকে নিয়ে বক্তব্য প্রদান করেন।

মাউশি অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার পরিচালক প্রফেসর একিউএম শফিউল আজম তার বক্তব্যে বলেন, "মহাপরিচালক মহোদয়ের এই শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রাপ্তি আমাদের টক, ঝাল, মিষ্টি এই তিনটি অনুভূতি এনে দিয়েছে। টক এইজন্য যে, আমরা কোভিড পরিস্থিতির কারণে স্যারের এই অর্জনকে জাকজমকভাবে উদযাপন করতে পারছি না, ঝাল এই কারণে যে, শুদ্ধাচার পুরস্কার পেয়ে স্যার আমাদের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন, আর মিষ্টি এই কারণে যে, এই শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রাপ্তি শিক্ষা ক্যাডারের জন্য একটি বিশাল স্বীকৃতি। স্যার আমাদের অভিভাবক হয়ে আমাদের জন্য এ পুরস্কার এনে দিয়েছেন। এ অর্জনকে ধরে রেখে শিক্ষা ক্যাডারের শত্রুদের কাজের মাধ্যমে উপযুক্ত জবাব দিতে হবে।"

মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) তার বক্তব্যে বলেন, "শুদ্ধাচার পুরস্কার পেয়ে মহাপরিচালক মহোদয় আমাদের গৌরবান্বিত করেছেন। আমরা যারা ক্ষুদ্র মানুষ এখানে আছি তিনি আমাদের বড় করেছেন। স্যারের যোগ্য নেতৃত্বে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাবৃন্দ স্ব স্ব দায়িত্ব পালন করে স্যারকে আরও সম্মানিত করবেন। এই পুরস্কার আমাদের প্রত্যাশাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সামগ্রিক বিবেচনায় যথার্থ ব্যাক্তিকেই দেয়া হয়েছে এই পুরস্কারটি। স্যার যেভাবে চর্চা করেছেন সেভাবে আমরা প্রত্যেকেই যদি সার্ভিসের ক্ষেত্রে চর্চাটি করি তবেই স্যারকে সম্মান প্রদর্শন করা হবে। শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রাপ্তি শিক্ষার মুখ উজ্জ্বল করেছে, শিক্ষা ক্যাডার সার্ভিসের মুখ উজ্জ্বল করেছে। আমরা সবাই মিলে স্যারকে অনুসরণ করে, আরও কাজে মনোনিবেশ করবো, স্যার যেভাবে শুদ্ধাচার চর্চা চালিয়ে গেছেন সেই চর্চাটা অব্যাহত রাখবো।"   

মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এ অর্জন সবার অর্জন। সংস্থার প্রধান হিসেবে পুরস্কার পাওয়া মানে হচ্ছে পুরো সংস্থার পুরস্কার পাওয়া। কারণ শুদ্ধাচার তো সংস্থার প্রধান একা করতে পারেন না, সবাই মিলে করলেই সেটা শুদ্ধাচার হয়। বিশাল এই সংস্থাটির বিভিন্ন শাখা, অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সারা দেশে ছড়িয়ে আছে। এত বড় প্রতিষ্ঠানকে শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদানের মানে হচ্ছে সরকারের স্বীকৃতি এই যে, একটা খুব বড় অংশ শুদ্ধাচারী হয়েছে। শুদ্ধাচার পুরস্কার দেশের জন্য, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য, সরকারের ইমেজের জন্য এই পুরস্কারটি কাজে লেগেছে এবং ভবিষ্যতেও লাগবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দুরদর্শী চিন্তাভাবনার প্রতিফলন এই শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রবর্তন। এই শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রাপ্তির ফলে আমাদের দায়দায়িত্ব আরও বেড়ে গেছে। এবং এই চর্চা কর্মস্থলসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে।

মহাপরিচালকের বক্তব্য শেষে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান অধিদপ্তরের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ। ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো শেষে একটি কেক কেটে এবং মিষ্টিমুখ করিয়ে এই খুশি উদযাপন করা হয়।  

শুদ্ধাচার পুরস্কার কারা পান

২০১৭ সালের ৬ এপ্রিল জারি করা হয় শুদ্ধাচার পুরস্কার প্রদান নীতিমালা, ২০১৭ সংক্রান্ত এক গেজেট। এতে সাক্ষর করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব (সমন্বয় ও সংস্কার) এন এম জিয়াউল আলম। ওই গেজেটে বলা হয়, 'সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়: জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল' শিরোনামে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল ২০১২ সালে মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদন করা হয়েছে, যা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইট, গেজেট ও পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। এ কৌশল বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় শুদ্ধাচার উপদেষ্টা পরিষদ এবং অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে উপদেষ্টা পরিষদের নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে। জাতীয় শুদ্ধাচার উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নৈতিকতা কমিটি গঠিত হয়েছে এবং নৈতিকতা কমিটির সদস্য সচিব শুদ্ধাচার ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে কাজ করছেন। সরকারের সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এ শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তার কর্মকৌশল প্রণয়ন করছে বলেও গেজেটে বলা হয়েছে।

গেজেটে বলা হয়েছে, সরকারের মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত কর্মচারীদের পুরস্কার প্রদানের উদ্দেশ্যে শুদ্ধাচার পুরস্কার নীতিমালা প্রণয়ন করা হলো। শুদ্ধাচার চর্চায় এই পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে যারা নির্বাচিত হবেন তারা হলেন

১. মন্ত্রণালয় বা বিভাগের সিনিয়র সচিব বা সচিব ২. প্রতিটি মন্ত্রণালয় বা বিভাগের গ্রেড ১ থেকে গ্রেড ১০ ভুক্ত একজন এবং গ্রেড ১১ থেকে ২০ পর্যন্ত একজনসহ মোট দুই জন কর্মচারী। ৩. মন্ত্রণালয় বিভাগ বা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মধ্য হতে একজন কর্মচারী, ৪. মন্ত্রণালয় বিভাগ বা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের আঞ্চলিক কার্যালয়সমূহ থেকে একজন কর্মচারী, ৫. মন্ত্রণালয় বিভাগ বা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের আঞ্চলিক কার্যালয়সমূহের গ্রেড ৩ থেকে ১০-ভুক্ত একজন কর্মচারী, ৬. গ্রেড ১১ থেকে ২০ পর্যন্ত একজন কর্মচারী, ৭. মাঠপর্যায়ের জেলাসমূহের মধ্য থেকে একজন কর্মচারী, ৮. মন্ত্রণালয় বিভাগ বা রাষ্ট্রীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের উপজেলা কার্যালয়সমূহের প্রধানদের মধ্য হতে একজন কর্মচারী।

এর ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কর্মচারী বলতে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, বা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বোঝাবে। ৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়, নীতিমালায় বর্ণিত সূচকের ভিত্তিতে এবং প্রদত্ত পদ্ধতি অনুসরণ করে এ পুরস্কার দেওয়ার জন্য কর্মচারী বাছাই বা নির্বাচন করা হবে। পুরস্কার প্রদানের জন্য সুপারিশ করার ক্ষেত্রে শুদ্ধাচার চর্চার জন্য নির্ধারিত গুণাবলির ১৮টি সূচকের প্রতিটির জন্য ৫ নম্বর করে মোট ৯০ নম্বর এবং মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, দফতর বা সংস্থা কর্তৃক ধার্যকৃত অন্যান্য কার্যক্রমে ১০ নম্বরসহ মোট ১০০ নম্বর বিবেচনা করা যেতে পারে।

শুদ্ধাচার পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত যে ১৯টি সূচকের কথা বলা হয় তার মধ্যে আছে- কর্মচারীর পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা, সততার নিদর্শন স্থাপন করা, নির্ভরযোগ্যতা ও কর্তব্যনিষ্ঠা, শৃঙ্খলাবোধ, সহকর্মীদের সঙ্গে আচরণ, সেবাগ্রহীতার সঙ্গে আচরণ, প্রতিষ্ঠানের বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, সমন্বয় ও নেতৃত্বদানের ক্ষমতা, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শিতা, পেশাগত স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক নিরাপত্তা সচেতনতা, ছুটি গ্রহণের প্রবণতা, উদ্ভাবনী চর্চার সক্ষমতা, বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি বাস্তবায়নে তৎপরতা, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশে আগ্রহ, উপস্থাপন দক্ষতা, ই-ফাইল ব্যবহারে আগ্রহ, অভিযোগ প্রতিকারে সহযোগিতা করা।

এতে আরও বলা হয়েছে,শুদ্ধাচার পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীকে উল্লেখিত সূচকের ১০০ নম্বরের মধ্যে অবশ্যই ৮০ নম্বর পেতে হবে। এটি না পেলে ওই কর্মচারী এই পুরস্কার পাওয়ার জন্য প্রাথমিকভাবে বিবেচিত হবেন না। আর বিবেচিত কর্মচারীদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া কর্মচারী শুদ্ধাচার পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হবেন। সিনিয়র সচিব বা সচিবদের মধ্যে এই পুরস্কারের জন্য যোগ্য কর্মচারী নির্বাচন করবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে গঠিত বাছাই কমিটি। আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধানদের মধ্য থেকে কর্মচারী বাছাইয়ের জন্য আঞ্চলিক প্রধানের নেতৃত্বে, জেলা পর্যায়ের কর্মচারী বাছাইয়ের জন্য আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রধানের নেতৃত্বে, উপজেলা পর্যায়ের কর্মচারী বাছাইয়ের জন্য জেলা কার্যালয়ের প্রধানদের নেতৃত্বে পৃথক বাছাই কমিটি থাকবে।’

গেজেটে এই পুরস্কারের ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, প্রতিবছর সরকারের শুদ্ধাচার পুরস্কারপ্রাপ্ত কর্মচারীরা পুরস্কার হিসেবে একটি সার্টিফিকেট এবং এক মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ পাবেন।


এ জাতীয় আরো খবর