সোমবার, ২১ জুন ২০২১, ৭ আষাঢ় ১৪২৮

শিক্ষা ক্যাডারে পদোন্নতি : ক্যাডারের দাবির প্রেক্ষিতে মহাপরিচালক রেজ্যুলেশনে স্বাক্ষর করেননি

  • স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
  • ২০২১-০৬-০৫ ০৩:০৩:৪৪
image
ফাইল ছবি

শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি নিয়ে নানান নাটকীয় ঘটনা ঘটে চলেছে। বর্তমানে সহকারী থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে  পদোন্নতির কাজ চলছিল। গত ৯ মে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সভা শুরু হয়ে শেষ হয়েছিল ২৯ মে। ৫ দিন টানা ডিপিসি চললেও মেলেনি কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি। ২৯ মে পদোন্নতির ডিপিসি সমাপ্ত হওয়ার পর সবার আশা ছিল তার পরদিনই জিও হয়ে যাবে। কিন্তু জিও হওয়া দূরে থাক সঠিক পদোন্নতির সংখ্যাটিও প্রথমে জানা যায়নি। একসময় জানা গেল ১০৮০ জনের পদোন্নতি হয়েছে। পরে জানা গেল সেটিও ঠিক নয়। ৯৫৯ জনের পদোন্নতি হয়েছে। প্রায় ৩,৪০০ পদোন্নতিপ্রত্যাশীর মধ্যে মাত্র ৯৫৯ জনের পদোন্নতিতে স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষা ক্যাডারের বৈষম্যের বিষয়টি প্রকটভাবে ফুটে ওঠেছে। এ নিয়ে শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন গ্রুপের ফেসবুক পোস্টগুলোর দিকে নজর দিলেই বুঝা যাবে কী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন পদোন্নতিপ্রত্যাশীরা।

আজ জুন মাসের ৫ তারিখ। মে মাসের ২৯ তারিখ শনিবার ডিপিসি শেষ হয়েছে। আজ আরেক শনিবার। এক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে। জিও জারির আশায় অনেকেই উন্মুখ হয়ে আছেন। কিন্তু শিক্ষা পত্রিকার এক অনুসন্ধানে জানা গেছে সহসা জিও জারি হচ্ছে না। শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি বঞ্চনার কথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট গিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এটি প্রধানমন্ত্রীর নিকট পৌঁছে দিয়েছেন বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সদস্যসচিব প্রফেসর মো. শাহেদুল খবির চৌধুরী এক ফেসবুক পোস্টে নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী চলছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন আছে সমস্ত নিয়োগ এবং পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার। অন্যান্য ক্যাডারে নিয়মিত পদোন্নতি হলেও শিক্ষা ক্যাডারে নিয়মিত পদোন্নতি হয় না। বিগত প্রায় ৩ বছর যাবৎ শিক্ষা ক্যাডারে সহযোগী এবং সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি নেই। এই দুই টায়ারে প্রায় ৫ হাজার কর্মকর্তা পদোন্নতির আশায় মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে দিনাতিপাত করছেন। যোগ্য হওয়া স্বত্ত্বেও পদোন্নতি না পাওয়া, পদোন্নতি না হওয়ায় নিম্নপদে কাজ করা, বেতন কম পাওয়া, কর্ম পরিবেশ অনুকূলে না থাকা এগুলো শিক্ষা ক্যাডারের হতাশার কারণ। 

এ সমস্ত বৈষম্য এবং বঞ্চনার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে শিক্ষা ক্যাডার। নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেবার প্রয়োজনেই এই ফুঁসে ওঠা। অনেক বঞ্চনা আর বৈষম্য শিক্ষা ক্যাডারের উপর জগদ্দল পাথরের ন্যয় চেপে আছে। এই বঞ্চনা আর বৈষম্য একদিনে গড়ে ওঠেনি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন। কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন একটি অপূর্ব নজির। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর স্বাধীনতা বিরোধীদের চক্রান্তে শিক্ষাকে পিছিয়ে রাখার নানান কর্মকাণ্ড পরিলক্ষিত হয়। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আন্ত:ক্যাডার বৈষম্য দূর করার অনুশাসন থাকা স্বত্ত্বেও এটি বাস্তবায়িত হচ্ছে না। শিক্ষা ক্যাডার আজ মূমুর্ষূ প্রায়। পদসৃষ্টি নেই, তাই পদোন্নতি নেই। পদ না থাকা ক্যাডার কর্মকর্তাদের অপরাধ নয়। অন্যান্য ক্যাডারে পদ না থাকলেও সুপার নিউমারারি পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি দেয়া হয়। অনেকসময় পদোন্নতি দিয়ে নিম্নপদে কাজ করার জন্য ইনসিটুও রাখা হয়। সব ক্যাডারে এভাবে পদোন্নতি চললে  শিক্ষা ক্যাডারে কেন হবে না তা ১৬ হাজার ক্যাডার সদস্যের জিজ্ঞাসা।

পদসৃষ্টি কেন করা হয় না, কার গাফিলতি, কারা পদসৃষ্টিতে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে এ বিষয়গুলো নিয়ে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির নেতৃবৃন্দ সোচ্চার। ৩,৪০০ পদোন্নতিপ্রত্যাশীর প্রত্যাশাকে সম্মান জানিয়ে সমিতির নেতৃবৃন্দ শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ অভিভাবক মহাপরিচালককে অনুরোধ করেছিলেন জিওতে স্বাক্ষর না করার জন্য। শিক্ষা ক্যাডারের সম্মানের প্রশ্নে আপোষহীন মনোভাব প্রদর্শন করে মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক জিওতে স্বাক্ষর করেননি। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ জুন বৃহস্পতিবার, সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে শিক্ষামন্ত্রণালয়ে ডিপিসি কমিটির রেজ্যুলেশন স্বাক্ষর করার জন্য মহাপরিচালককে মন্ত্রণালয়ে ডাকা হয়েছিল। শিক্ষাসচিবকে শিক্ষা ক্যাডারের মর্যাদার প্রশ্নে তিনি এই রেজ্যুলেশনে স্বাক্ষর করবেন না বলে জানিয়ে দেন। ১৬ হাজার শিক্ষা ক্যাডারের অভিভাবক হিসেবে তিনি এই অবস্থান নেওয়ায় শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা খুবই খুশী। 

শিক্ষা ক্যাডারের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা শিক্ষা পত্রিকাকে নিশ্চিত করেন যে, মহাপরিচালক রেজ্যুলেশনে স্বাক্ষর করেন নি। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির জন্য যে ডিপিসি কমিটি আছে তার সর্বমোট মেম্বার ৫ জন। শিক্ষাসচিব কমিটির সভাপতি। শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সদস্যসচিব। অন্য তিনজন সদস্যের একজন শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরই অতিরিক্ত সচিব (কলেজ)। অপর দুজন হলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিব এবং অর্থমন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্মসচিব। ৫ সদস্যের মধ্যে সদস্যসচিব প্রফেসর সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক রেজ্যুলেশনে স্বাক্ষর না করায় জিও জারি আপাতত হচ্ছে না বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে। তবে অচিরেই প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে গ্রীন সিগন্যাল পাওয়া গেলে দ্রুত পদোন্নতিযোগ্য সবার পদোন্নতি নিশ্চিত করে জিও জারি করা হবে। প্রয়োজনে ডিপিসি কমিটির সভা আরও কয়েকদিন লাগলেও বসতে হবে এবং শিক্ষা ক্যাডারের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখেই পদোন্নতির কাজটি সম্পন্ন করা হবে বলে নিশ্চিত করেছেন উক্ত ক্যাডার কর্মকর্তা।

এদিকে পদোন্নতির সভা ২৯ মে শেষ হওয়ার পরও জিও জারি না হওয়ায় প্রকৃতপক্ষে কী ঘটছে তা জানতে চেয়ে অনেকেই ফেসবুকে শিক্ষা ক্যাডারের গ্রুপগুলোতে পোস্ট দিচ্ছেন। কেউ কেউ পোস্টে আকুতি জানাচ্ছেন আগামী রোববারের মধ্যে জিও জারি করে ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু অনেক কর্মকর্তাই পদোন্নতির ক্ষেত্রে মুষ্টিভিক্ষাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ৩৪০০ জনের স্থলে মাত্র ৯৫৯ জনের পদোন্নতিকে মুষ্টিভিক্ষার সাথে তুলনা করে অনেক ক্যাডার কর্মকর্তা বলছেন জিও জারি হতে আরও কিছুদিন দেরি হলেও সবাই ধৈর্য্য ধারণ করে ক্যাডারে সর্বোচ্চসংখ্যক পদোন্নতি প্রত্যাশা করেন।   

শিক্ষা ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা শিক্ষা পত্রিকাকে বলেন, শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি নিয়মিত থাকলে পদোন্নতির ক্ষেত্রে এই জটিলতা থাকতো না। শিক্ষা ক্যাডারের অধিকসংখ্যক পদোন্নতি না দেবার কারণ হিসেবে যে যুক্তি প্রদর্শন করা হয় তা হলো উপরের দিকে পর্যাপ্ত পদ নেই। এই দোষ তো শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের নয়। শিক্ষা ক্যাডার একটি বড় ক্যাডার। সংখ্যার দিক দিয়ে স্বাস্থ্য ক্যাডারের পরই শিক্ষা ক্যাডারের অবস্থান। স্বাধীনতার পর থেকে এই ক্যাডারের প্রশাসনিক বিকাশকে ঠিকভাবে পরিচর্যা করা হয়নি। শিক্ষার সবকিছু শিক্ষা ক্যাডারের হাতে থাকার কথা থাকলেও এই ক্যাডারকে বিকশিত হয়ে দেওয়া হয়নি। কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠী আজও এ ক্যাডারের পদগুলো দখল করে শিক্ষা ক্যাডারের সর্বনাশ করে ছাড়ছে। তরুণ প্রজন্ম আজ জেগে ওঠেছে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আর তারই প্রতিফলন মহাপরিচালক কর্তৃক ডিপিসি কমিটির রেজ্যুলেশনে স্বাক্ষর না করা। শিক্ষা ক্যাডারের মাথা উঁচু করে পথচলা শুরু হলো এই ঘটনা থেকে- তিনি আরও যোগ করেন।

অবশ্য এই ঘটনার নেপথ্য কারিগর বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সদস্যসচিব প্রফেসর মো. শাহেদুল খবির চৌধুরীর বলে জানিয়েছেন সমিতির একজন নেতা। সমিতির সদস্যসচিব শিক্ষা ক্যাডারের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হয়ে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। জানা যায়, ডিপিসি কমিটির সভার সদস্য না হয়েও তিনি ডিপিসির সভায় শিক্ষা ক্যাডারের ২৬ ব্যাচ পর্যন্ত পদোন্নতির পক্ষে কথা বলেছেন। শিক্ষা ক্যাডারের দাবি পূরণ না হলে ১৬ হাজার ক্যাডার সদস্যকে নিয়ে মুভমেন্টে যাবেন বলে ডিপিসি কমিটিকে জানিয়েছেন। সদস্যসচিব শাহেদুল খবির চৌধুরী শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি বঞ্চনা জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর হাত দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে শিক্ষা ক্যাডারের প্রত্যাশিত সর্বোচ্চসংখ্যক পদোন্নতি নিশ্চিত করার জন্য যা যা করা দরকার তা করে যাচ্ছেন। শিক্ষা ক্যাডারের সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য সমিতির নেতৃবৃন্দ ক্যাডার সদস্যদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। যোলো হাজার ক্যাডার সদস্য এক থাকলে এ ক্যাডারে বিজয় আসবেই বলে সমিতির নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেন।   

২৯ মে ডিপিসির মিটিং সম্পন্ন হওয়ার পর একসপ্তাহ চলে গেলেও জিও জারি না হওয়ায় প্রতিক্রিয়া কি- ২২ ব্যাচের একজন কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি শিক্ষাপত্রিকার প্রতিবেদককে বলেন, মহাপরিচালক মহোদয় যদি সত্যিই রেজ্যুলেশনে স্বাক্ষর করে না থাকেন তাহলে বলবো এটি শিক্ষা ক্যাডারের বৈষম্য বঞ্চনার প্রতিবাদে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। আমাদের কিছুদিন অপেক্ষা করতে হলেও আমরা অপেক্ষা করবো।  দশ বারো বছর পদোন্নতিহীন আছি, যা ক্ষতি হবার তাতো হয়েই গিয়েছে। আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু আমরা শিক্ষা ক্যাডারের বৈষম্য বঞ্চনার অবসান চাই। পদোন্নতিযোগ্য সবার পদোন্নতি নিশ্চিত করেই জিও জারি হোক। শিক্ষা ক্যাডারের ইতিহাসে এই যুগান্তকারী ঘটনার নেপথ্য কারিগর শিক্ষা ক্যাডারের আস্থাভাজন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সদস্যসচিবকেও তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। সদস্যসচিবের নেতৃত্বে শিক্ষা ক্যাডারের সুদিন ফিরে আসবে বলেও তিনি দৃঢ় আশা ব্যক্ত করেন।

শিক্ষা ক্যাডারের সর্বশেষ নিউজ পেতে আমাদের ফেসবুক পেজে লাইক দিয়ে সংযুক্ত থাকুন। শিক্ষাপত্রিকা ফেসবুক পেজ


এ জাতীয় আরো খবর