বৃহস্পতিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ আশ্বিন ১৪২৮

করোনাকালীন বিকল্প শিক্ষা ভাবনা ও শিক্ষার্থীদের মোবাইল আসক্তি থেকে রক্ষা করার উপায়

  • মোঃ মোসলেম উদ্দিন, শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা
  • ২০২১-০৫-২৮ ১১:৫৫:৪১
image

প্রায় দেড় বছর ধরে মহামারি আকার ধারণ করা বৈশ্বিক কোভিড-১৯ এর তাণ্ডবে বিপর্যস্ত জীবন পরিক্রমায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সেক্টরে পরিণত হচ্ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। যদিও মহামারির প্রথম থেকেই ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা নিয়ে আমাদের শিক্ষকগণ তাঁদের ব্যক্তিগত ব্যয়ে অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং নেটওয়ার্কজনিত অসুবিধার কারণে সবার পক্ষে এ সেবা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ধনী-গরীব ও সচেতন-অসচেতন পরিবারের ওপর ভিত্তি করে শিক্ষা বৈষম্য প্রকট হয়ে ওঠছে। তাছাড়া যাদেরকে আমরা মোবাইল থেকে দূরে থাকতে বলি বিশেষ করে আমাদের উচ্চমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের, তারা আজ পড়ালেখার বাহানা দিয়ে মোবাইলে অপসংস্কৃতি থেকে শুরু করে পর্ণগ্রাফিতে পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছে! আবার সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের মাধ্যমে কোনোরকমে তাদের পাস করিয়ে বের করে দেবার যে চিন্তা করা হচ্ছে তাতেও চরম ক্ষতি হবে শিক্ষার্থীদের জন্য। আর শিক্ষার্থীদের ক্ষতি মানে আমাদের ক্ষতি তথা দেশেরই ক্ষতি হবে। তাই যতদিন সরাসরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান সম্ভব নয় ততদিন এমন কোনো পন্থায় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে হবে যাতে ব্যয় নির্বাহের কারণে কোনো শিক্ষার্থী বৈষম্যের শিকার না হয় এবং অনলাইন ক্লাসের ছলে তারা মোবাইলে আসক্ত না হয়ে পড়ে এবং স্বাস্থ্যবিধিও যেন ঠিক থাকে।

উপর্যুক্ত বিষয়ের আলোকেই সবার মতো দুশ্চিন্তা থেকে আমার কিছু উপলব্ধি ও প্রস্তাবনা তুলে ধরছি:

সংক্ষিপ্ত সিলেবাস করতে গিয়ে দেখা গেছে কিছু কিছুু অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে। এভাবে যদি আমরা উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ছেড়ে দেই তাহলে তারা উচ্চশিক্ষায় গিয়ে পড়ার ধারাবাহিকতার লিংক খুঁজে পাবে না অর্থাৎ একটি পরিপূর্ণ গল্পের অতৃপ্তিতে ভুগবে এবং তাদের ভিত দুর্বল হয়ে পড়বে। যদি আমার বিষয় জীববিজ্ঞান প্রথম পত্রের কথাই বলি, সেখানে প্রথম অধ্যায় অর্থাৎ কোষ এবং এর গঠন বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ এ অধ্যায় ভালোভাবে না বুঝলে কোষ বিভাজন থেকে শুরু করে জীবপ্রযুক্তি, জৈবিক কার্যাবলি, কোষরসায়ন এসব শিক্ষা অপূর্ণাঙ্গ থেকে যাবে। তাই সংক্ষিপ্ত সিলেবাস না করে যদি আমরা প্রত্যেক অধ্যায় বা টপিক এর মৌলিক বিষয়গুলো পড়াই তাতে সময়ও কম লাগবে এবং ভবিষ্যতে টপিক ভিত্তিক বেসিক নলেজের ওপর ভিত্তি করে তারা বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিতে চাইলে জানতে পারবে এবং তেমন অসুবিধায়ও পড়বে না। তেমনিভাবে উচ্চশিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও সিলেবাস সংক্ষিপ্ত না করে প্রতি বিষয়ের মৌলিক বিষয়গুলো পড়িয়ে দিলে ভবিষ্যতে কেউ গবেষণা করতে চাইলেও তেমন সমস্যায় পড়বে না।

আমরা জুম, গুগলমিট, ইউটিউব, লাইভ যেভাবেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দান করি না কেন তাতে ভৌগোলিক অবস্থান, শিক্ষার্থীর বসবাসরত পরিবেশ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও কারিগরি দক্ষতা এর যেকোনো একটার অভাবে বৈষম্য সৃষ্টি হবেই। তাছাড়া দীর্ঘদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে গ্রামে বা শহরে টিনএজ ছেলে-মেয়েদের এমনকি প্রাথমিকের শিশুরাও অনলাইন ক্লাসের আড়ালে মোবাইলে আসক্ত হয়ে পড়ছে। কাজেই এ অবস্থা থেকে উত্তরণে করোনা পরিস্থিতি যতদিন স্বাভাবিক না হয় ততদিন নিম্নলিখিত উপায়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারলে এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করি।

প্রস্তাবনা ও পদ্ধতি:

মহল্লা বা গ্রাম ভিত্তিক যে ডিস এন্টেনার লাইন আছে তার ক্যাবল অপারেটরদের নির্দিষ্ট একটি ভিডিও চ্যানেল আছে। ওই চ্যানেলে দিনে বা রাতের নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান র্কতৃক বিতরণকৃত সিডি বা পেনড্রাইভ বা মেইলে প্রেরণকৃত রুটিন মাফিক ক্লাসের ভিডিও প্রচার করলে শিক্ষা দান অনেকটা ফলপ্রসূ হবে। এ কাজের তদারকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ( মেম্বার বা কাউন্সিলর) অবগতি সাপেক্ষে মাঠ পর্যায়ে অবস্থানরত যেকোনো স্তরের শিক্ষককে পরিচালনার দায়িত্ব অপর্ণ করা যেতে পারে। যদি কোনো পাড়া বা মহল্লায় ডিস বা স্যাটেলাইট লাইনের সুবিধা না থাকে তাহলে সেক্ষেত্রে ওই মহল্লা বা গ্রামের কোনো বাড়ির উঠান বা যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙ্গিনা ব্যবহার করে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে স্থানীয় পর্যায়ের শিক্ষক দ্বারা পরিবেশনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকে অবহিত করে করা উচিত হবে শৃঙ্খলার স্বার্থে। এ কাজে সহায়তার জন্য উপজেলা বা জেলার শিক্ষা অফিসকেও দায়িত্ব দিতে হবে।

-প্রতিটি অধ্যায়ের ক্লাস সংগ্রহ ও আপলোডের দায়িত্ব জেলার প্রধান সরকারি কলেজগুলোকে নিতে হবে। তাদেরকে অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি কলেজ থেকে রুটিন অনুযায়ী ক্লাস সংগ্রহ ও পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করতে হবে। সরকার চাইলে পরিকল্পনা করে এভাবে অঞ্চল ভিত্তিক আলাদা প্রশ্ন করে শিক্ষার্থীদের বাড়িতে বসিয়ে পরীক্ষাও নেওয়া যেতে পারে। তারপর শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট কোথাও খাতা জমা রেখে গেলে অঞ্চলের প্রতিনিধির মাধ্যমে তা জেলার প্রধান কলেজে এনে পরীক্ষকদের মাঝে বিতরণ করা যাবে। যেহেতু করোনা একটি জাতীয় সমস্যা এবং আমরা সবাই দেশের জন্যই কাজ করছি, তাই সবাই মিলে সমন্বয় ও পরিশ্রম করলে একেবারে স্বল্প ব্যয়ে এবং শিক্ষার্থীদের মোবাইল আসক্তি না করেই আমরা করোনার মাঝে শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারি। কেন্দ্রীয় টিভি বা অন্য কোনো পরিবেশনার চেয়ে স্থানীয় পর্যায়ে এভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালু হলে শিক্ষার্থীরা একটি তদারকির আওতায় আসবে, তাতে শিক্ষার্থীদের বিপদগামিতাও রোধ হবে এবং শিক্ষা বৈষম্যও কমে আসবে। এ বিষয়ে ভিজিলেন্স টিম গঠন করে তদারকি করে কাজকে এগিয়ে নিতে পারলে করোনা মহামারি আমাদের শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের বেশি ক্ষতি করতে পারবে না বলে বিশ্বাস করি।

লেখকের নাম : মোঃ মোসলেম উদ্দিন পদবী : প্রভাষক (উদ্ভিদবিদ্যা) বিসিএস ব্যাচ : ৩৫  কর্মস্থল : বৃন্দাবন সরকারি কলেজ, হবিগঞ্জ। ই-মেইল :[email protected]


এ জাতীয় আরো খবর