সোমবার, ২১ জুন ২০২১, ৭ আষাঢ় ১৪২৮

শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি নিয়ে নেটিজেনরা কে কী ভাবছেন

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২০২১-০৫-০৬ ০২:৫৩:১১
image

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্যাডার। প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার সদস্য কর্মরত আছেন শিক্ষা ক্যাডারে। অন্যান্য সব ক্যাডারের মতই বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের বিভিন্ন পরীক্ষার কষ্টিপাথরে যাচাইকৃত হয়েই আসতে হয় এ ক্যাডারে। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারে একজন নবীন কর্মকর্তা যোগদান করেই হতাশায় নিমজ্জিত হন। তার প্রথম পোস্টিং হয় সরকারি কলেজে প্রভাষক হিসেবে। মুষ্টিমেয় কিছু সরকারি কলেজ ব্যতীত অধিকাংশ কলেজেরই হতশ্রী অবস্থা। বিভাগ নাই, টেবিল-চেয়ার নাই, লোকবল নাই, কর্মস্থলে থাকার জায়গা নাই, মর্যাদা নাই এরকম এক কঠিন  অবস্থায় এসে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা প্রথমেই ধাক্কা খান।  শ্রেণিকক্ষে পাঠদানসহ শিক্ষা প্রশাসনে অবদান রাখার জন্য ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োজিত হলেও শিক্ষা ক্যাডারের অধিকাংশ কর্মকর্তাই সে সুযোগ পান না। কারণ শিক্ষা প্রশাসনের অনেক পদই এখন অন্যের দখলে।  অন্যান্য ক্যাডারের জৌলুসপূর্ণ সুবিধাদি দেখে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত হীনমন্যতায় ভোগেন।

কিন্তু এটি হওয়ার কথা ছিল না। শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারাও সম্মানজনকভাবে অন্যান্য ক্যাডারের ন্যায় সমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে চাকরি করার কথা ছিল। বিসিএস ক্যাডার কম্পোজিশন এবং ক্যাডার রুলস-এ সেরকমটাই বলা আছে। কিন্তু বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার সার্ভিসের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ রিফর্ম ঠিকভাবে বিকশিত হতে দেওয়া হয়নি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশ যেভাবে পরিচালিত হয়েছে, যাদের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে, স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি, সামরিক শক্তি, কেউই শিক্ষা ক্যাডারকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার কথা ভাবেনি।

১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের অপতৎপরতায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিভাজিত হয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আলাদা হয়। পরবর্তীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও বিভাজিত হয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বিভাগ নামে দু'টো বিভাগ হয়ে শিক্ষার বিভাজন আরও প্রকট হয়। কিন্তু বিভাগগুলোতে শিক্ষা ক্যাডারের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। 

২০০১ সালে পুনরায় স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-বিএনপি জোট ক্ষমতায় গিয়ে শিক্ষার উপরে সবচেয়ে বড় আঘাত হানে। শিক্ষা ক্যাডারকে পাশ কাটিয়ে ২০০৪ সালে নায়েমের একটি নিয়োগ বিধি প্রণয়ন করা হয়। সে নিয়োগবিধিতে শিক্ষা ক্যাডারকে সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয় । শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এই নায়েম।  এই ষড়যন্ত্রের এখানেই শেষ হয়নি। ২০০৪ সালেই প্রথমবারের মতো প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে অন্য ক্যাডার কর্মকর্তাকে পদায়ন করা হয়। এই ষড়যন্ত্র পুরোটাই হয়েছে ৯১ থেকে ৯৬ সাল এবং ২০০১ থেকে পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার থাকাকালীন সময় পর্যন্ত। শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্পে পদায়ন করা হয়েছিল শিক্ষা ক্যাডারের বাইরে থেকে অন্যান্য ক্যাডার কর্মকর্তাদের। পরবর্তীতে নানান ক্ষোভ ও প্রতিবাদের কারণে কিছু কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেয়া হয়।

এই ষড়যন্ত্র এখনো চলছে। পদোন্নতি আটকে দেয়া, পদ সৃজন না হওয়া, সমন্বিত পদ সৃজনের কাজটি নানা অজুহাতে আটকে দেয়া, শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের স্কেল আপগ্রেডেশন না হওয়া, শিক্ষা ক্যাডারের প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি না করা সেইসব ষড়যন্ত্রেরই অংশ। তবে আশার কথা এই যে তরুণ ক্যাডার কর্মকর্তাদের সচেতনতায় শিক্ষা ক্যাডারের এই অচলাবস্থা ধীরে ধীরে কাটছে। এক সময় শিক্ষা ক্যাডারে আত্তীকৃতদের আধিক্য এবং দাপট ছিল। ২০১৮ বিধি প্রণীত হওয়ার পর সে ভয় আর নেই। কলেজ সরকারি হলেই শিক্ষকরা ক্যাডারে আত্তীকৃত হয়ে এই ক্যাডারটিকে একটি হাস্যকর ক্যাডারে পরিণত করার চক্রান্ত চলছিল। কিন্তু বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির যোগ্য নেতৃত্বে এবং তরুণ ক্যাডার কর্মকর্তাদের সচেতনতার কারণে ২০১৮ বিধি শিক্ষা ক্যাডারের স্বার্থ সংরক্ষণে একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। 

বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের একতাবদ্ধ করার লক্ষ্যে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির আয়োজনে সম্প্রতি ধারাবাহিক  সংলাপ শুরু হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ আগে এই ধারাবাহিক সংলাপ অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয়। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সদস্যসচিব প্রফেসর মো. শাহেদুল খবির চৌধুরী সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। শিক্ষা ক্যাডারের ইতিহাসে এটি একটি অনন্য উদ্যোগ। সবচেয়ে নবীন ৩৮ ব্যাচ থেকে শুরু করে ১৪ ব্যাচ পর্যন্ত প্রায় শতাধিক ব্যাচ প্রতিনিধি এই অনলাইন সংলাপে অংশগ্রহণ করেন। এই ইতিবাচক উদ্যোগের ফলে মন খুলে সবাই শিক্ষা ক্যাডারের নানান বৈষম্য, বঞ্চনা নিয়ে আলোচনা করা এবং জানার সুযোগ পায়। আর এতে তরুণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশনার অনুসন্ধান করতে পারবে বলে শিক্ষা ক্যাডারের তরুণ নেতৃত্ব মনে করে। 

অন্যান্য ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সাথে মিল রেখে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে বলে অধিকাংশ কর্মকর্তা অনলাইন সংলাপে মত ব্যক্ত করেন। মর্যাদাগত  বৈষম্যের পাশাপাশি আর্থিক বৈষম্যও শিক্ষা ক্যাডারের একটি কমন চিত্র। ধীরে ধীরে এ বৈষম্যগুলো কমিয়ে আনতে হবে। আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসনও আছে। এ অনুশাসন বাস্তবায়নে ১৬,৫০০ ক্যাডার কর্মকর্তাকে এক থাকতে হবে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি ক্যাডার কর্মকর্তাদের একমাত্র প্ল্যাটফর্ম। ক্যাডার কর্মকর্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণে এর বিকল্প নেই। তাই এই প্ল্যাটফর্মটিকে আরো সুসংহত করতে হবে। ঈদের পরে নির্বাচন দিয়ে সমিতিকে যোগ্য নেতৃত্বের হাতে তুলে দেয়ার লক্ষ্যে সমিতির বর্তমান নেতৃবৃন্দ কাজ করছেন বলে অনলাইন সংলাপে জানান।

শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন ফেসবুক গ্রুপে সম্প্রতি পদোন্নতি জনিত ডিপিসির মিটিং নিয়ে নেটিজেনরা আলোচনায় মেতে উঠেছেন। মে মাসের ৯ তারিখে সহকারী থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির মিটিং। এত বঞ্চনা বৈষম্যের মধ্যে ও এটি একটি স্বস্তির সংবাদ। দীর্ঘদিন ধরে যেহেতু পদোন্নতি বন্ধ ছিল তাই পদোন্নতিযোগ্য সবাই পদোন্নতি পাওয়ার দাবিদার। এ লক্ষ্যে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি কাজ করে যাচ্ছে। ২৭ ব্যাচ পর্যন্ত সবাইকে (প্রশাসন ক্যাডারের সাথে মিল রেখে), সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি প্রদানের জন্য সমিতির জোর দাবি আছে।

পদোন্নতি নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে নানান অভিমত, নানান মন্তব্য। কেউ কেউ অভিমান করে আর্থিক সুবিধাহীন পদোন্নতি চাননা বলেও মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ পদোন্নতির তারিখ নির্ধারণে সমিতির প্রচেষ্টাকে ক্রেডিট নেওয়া সংক্রান্ত তীর্যক মন্তব্যও ছুঁড়েছেন। তারপরও অধিকাংশ কর্মকর্তাই পদোন্নতির ডিপিসিকে স্বাগত জানিয়েছেন। অনেকে সহযোগী অধ্যাপকদের সাথেই সহকারী অধ্যাপক পদেও পদোন্নতির বিষয়টি উত্থাপন করেছেন ফেসবুকে। জহিরুল হক স্বপন নামে একজন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা লিখেছেন, আর্থিক সুবিধা ব্যতীত পদোন্নতি, গ্রেড পরিবর্তন ব্যতীত পদোন্নতি, চতুর্থ গ্রেড থেকে চতুর্থ গ্রেডে পদোন্নতি,  একই ব্যাচের কর্মকর্তা আগে পদোন্নতি পেলে ৫ম গ্রেড পরে পদোন্নতি পেলে ৪র্থ গ্রেড... এই সবের মধ্যে কষ্টের পরিসমাপ্তি ঘটবে কিভাবে স্যার! 

ফেসবুকে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির খবরে খুশির ঢেউ লাগে মাউশি অধিদপ্তরের কলেজ শাখার একজন কর্মকর্তার ৩ মে তারিখের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে। কলেজ শাখার উপ-পরিচালক প্রফেসর শাহ্ আমীর আলী এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন, 'অল্প দিনের মধ্যে কষ্টের পরিসমাপ্তি ঘটবে'। তার কয়েক ঘণ্টা পর বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির দপ্তর সম্পাদক সৈয়দ মইনুল হাসানের আরেকটি স্ট্যাটাসে ডিপিসি'র তারিখ নির্ধারণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়।

মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের কলেজ শাখা গতবছরই পদোন্নতিজনিত সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করে ডিপিসি'র তারিখের জন্য মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী ছিল। দীর্ঘদিন ফাইলটি নড়াচড়া করে নি, ফলে ডিপিসি'র ডেটও পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির নিরলস প্রচেষ্টায়, শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষা উপমন্ত্রীর নির্দেশনায় ডিপিসির তারিখ পাওয়া গেছে। ৯ মে সকাল ১১ টায় মন্ত্রণালয়ে ডিপিসির মিটিং বসবে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই দিনটির দিকে পদোন্নতি প্রত্যাশীরা তাকিয়ে আছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের সভাপতিত্বে এই ডিপিসি'র সভা হবে। মাউশি অধিদপ্তরের কলেজ শাখা সূত্রে জানা গেছে, ডিপিসি'র সমস্ত প্রাক-প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখা হয়েছে।

২০১৮ সালে শিক্ষা ক্যাডারের তিনটি টায়ারেই পদোন্নতি হয়েছিল। ২০১৯ সালে নিয়মিত পদোন্নতি হয়নি। ২০২০ সালে সহযোগী অধ্যাপক থেকে অধ্যাপক পদে মাত্র একটি টায়ারেই পদোন্নতি হয়।  সমিতির কর্মকর্তারা আশা করছেন ২০২১ সালেই ঈদের আগে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি হবে। ঈদের পরপরই সহকারী অধ্যাপক পদেও পদোন্নতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। পদোন্নতি জনিত সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি শিক্ষা ক্যাডারের অন্যান্য সমস্যাগুলোর সমাধানও পর্যায়ক্রমে করার বিষয়ে সমিতির নেতৃবৃন্দ কাজ করে যাচ্ছেন। এজন্য বর্তমান সরকারের প্রতি আস্থা রেখে, ধৈর্য্য সহকারে চলমান সংকটগুলো উত্তরণের জন্য সবাইকে সমিতির পতাকাতলে এক হয়ে কাজ করতে হবে বলে সমিতির নেতৃবৃন্দ মনে করেন।


এ জাতীয় আরো খবর