শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১, ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮

নানান স্মৃতিবিজড়িত ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষী বিক্রমপুরের "কল-রেডী"

  • স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
  • ২০২১-০৪-৩০ ১৬:৪১:৪৪
image

১৯৭১ এর অগ্নিঝরা সেই মার্চের ৭ তারিখে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীপ্তকণ্ঠে কাঁপিয়ে দেওয়া সেই ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলার মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। কালের পরিক্রমায় বঙ্গবন্ধুর মহাকাব্যিক ৭ মার্চের ভাষণকে জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক 'বিশ্ব ঐতিহ্যের দলিল' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু সেই ভাষণ যে শব্দযন্ত্রের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র, সেই 'কল-রেডী' আজও স্বীকৃতির অপেক্ষায়।

১৯৪৮ সালের কথা। মুন্সিগঞ্জ জেলাধীন শ্রীনগর উপজেলার মঠবাড়িয়া গ্রামের আপন দুই ভাই দয়াল ঘোষ ও হরিপদ ঘোষ। ঐ বছর পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে মাইকের ব্যবসা শুরু করলেন। প্রথমে এই প্রতিষ্ঠান নাম ছিল 'আই এম অলওয়েজ রেডি, অন কল এট ইয়োর সার্ভিস বা আরজা (এআরজেএ)  ইলেক্ট্রনিক্স। এর বছরখানেক পরেই নামকরণ হয় কলরেডী নামে। যার স্থান ছিল ১৯৪৮ এয স্বাধিকার আন্দোলনে, ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনে, ১৯৬২ এর শিক্ষা আন্দোলনে, ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে আর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়। পরিণত হয় বাংলার ইতিহাসের এক জ্বলন্ত সাক্ষী রূপে। বাঙালির প্রধান প্রধান আন্দোলন-সংগ্রামের সভা-সমাবেশে ছিল এই কলরেডী মাইক কোম্পানি।

কলরেডী'র সেইদিনের মাইক, স্ট্যান্ড আজও আছে প্রতিষ্ঠানকে সংরক্ষণে। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে সেগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ এতদিনেও নেওয়া হয়নি। অবহেলা অযত্নে নষ্ট হওয়ার পথে সেই অমূল্য স্মৃতিগুলো। তাই প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি হারিয়ে যাবে বঙ্গবন্ধুর কন্ঠ কাঁপানো সেই শব্দযন্ত্রগুলো?

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন,  ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের সভা-সমাবেশেও কল-রেডী মাইকে বক্তব্য দিয়েছেন নেতারা। আর ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ তো এখন আরেকটি ইতিহাস। ৪৯ বছর আগে বঙ্গবন্ধুর সেই আওয়াজ উজ্জীবিত করেছিল সাড়ে সাত কোটি স্বাধীনতাকামী মানুষকে। যে কন্ঠ কোটি মানুষের কানে পৌঁছে গিয়েছিল কলরেডী মাইকের মাধ্যমে সেসব মাইক এখনো পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়। এরইমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে ৭ মার্চে ব্যবহৃত অনেক শব্দযন্ত্র।

বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই ভাষণের শব্দযন্ত্রগুলোর কি অবস্থা জানতে চাইলে 'কলরেডী'র মহাব্যবস্থাপক বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, বঙ্গবন্ধুর সেদিনের অগ্নিঝরা বক্তব্যের সাক্ষী মাইক স্ট্যান্ডগুলো বহুকষ্টে সংরক্ষণ করেছি। জনসভা শেষ হতে না হতেই খবর আসে কলরেডীর দোকানে আগুন দিয়েছে পাকিস্তানি সর্মথকরা। তবে আফসোস, এতদিনেও এগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দেওয়া হয়নি কোনো স্বীকৃতিও।

বিশ্বনাথ ঘোষ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আমাদের প্রজন্ম পর্যন্ত এ পেশায় আছি। পরবর্তী প্রজন্ম এই পেশায় থাকবে কিনা সন্দেহ আছে। তাদের এই পেশায় থাকার আগ্রহও নেই। তাই এই গুলো সংরক্ষণ করা জরুরি। এখন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী বা মুজিব শতবর্ষ চলছে। আমার মনে হয় এটিই মোক্ষম সময় এগুলো সংরক্ষণ করার।

পাকিস্তানি শোষণ বঞ্চনা আর সত্তরের নির্বাচনে জয়ের পরও ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় বাংলার মানুষ তখন অগ্নিগর্ভ। এরই মধ্যে চলে এল ১৯৭১ এর অগ্নিঝরা মার্চ মাস। ৭ মার্চ জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন সাত কোটি মানুষের প্রানের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশবাসী, বিশ্ববাসী তাকিয়ে কি বলতে যাচ্ছেন বঙ্গবন্ধু। ঘুম হারাম তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর। বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেবেন, তার এ বক্তব্য ছড়িয়ে দিতে হবে আনাচে-কানাচে। কলরেডীর মালিক হরিপদ ঘোষ ও দয়াল ঘোষ কে ধানমন্ডির বাসায় ডেকে পাঠালেন বঙ্গবন্ধু। নির্দেশ দিলেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে মাইকের ব্যবস্থা করতে।

জনসভা যাতে সফল না হয় সেজন্য প্রতিবন্ধকতা, হুমকি-ধামকি ছিল। জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই তাদের নিষেধ করলেন। কিন্তু হরিপদ ঘোষ ও দয়াল ঘোষের রক্তেও তখন শোষকদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বপ্ন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে মাইক সরবরাহের কাজে নেমে পড়ে কল রেডী। তখন রেসকোর্সে মাইক লাগানো সহজ ছিল না। কারণ শাসকগোষ্ঠীর সতর্ক চোখ ছিল রেসকোর্স ময়দানে।

সেদিনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে হরিপদ ঘোষের চার ছেলের একজন বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে লুকিয়ে মাইক লাগাতে গিয়েছিলেন আব্বা ও কাকা। মাইক লাগিয়ে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিলেন তারা। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কিছু বাড়তি মাইক বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মজুদ রাখা হয় যেন সমাবেশের দিন তাৎক্ষণিকভাবে লাগানো যায়। তিনদিন ধরে ৩০ জন কর্মী নিয়ে বাঁশ, খুঁটি গাঁথার কাজ করেন তারা। বঙ্গবন্ধুর ভাষণকালে যেন কোন যান্ত্রিক ত্রুটি না হয় সেজন্য নিজে উপস্থিত থাকার পাশাপাশি একজন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ দিয়েছিলেন হরিপদ ঘোষ। অতিরিক্ত তিনটি মাইক্রোফোন সঙ্গে রেখেছিলেন দয়াল ঘোষ। পরেরদিন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হল। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ কলরেডীর  মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিলেন, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' তবে জনসভা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কলরেডীর দোকানে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়।

এত বছর বছরেও কেন উপেক্ষিত কল রেডি?

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে কলরেডীর যে মাইকগুলো ছিল, সেগুলো অযত্ন আর অবহেলায় নষ্ট হতে বসেছে। ঐদিন জনসভায় ব্যবহৃত মাইক্রোফোনের স্ট্যান্ডটি আজও সংরক্ষিত আছে কলরেডীর কাছে। সেদিন যেসব অ্যামপ্লিফায়ার ব্যবহার করা হয়েছিল তার মধ্যে বেশ কয়েকটি এখনো আছে। আর আছে চারটি মাইক্রোফোন।

যে প্রতিষ্ঠানটি ইতিহাসের অংশ, জীবন্ত সাক্ষী, সেই প্রতিষ্ঠানটিকে এখনো স্বীকৃতি না দেওয়া এবং সেই দিনের ব্যবহৃত শব্দযন্ত্রগুলো কেন সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না সেই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে উঠে আসছে। বিশেষ করে মুজিববর্ষে এ দাবি আরও জোরালোভাবে উঠে আসছে। বাঙালির প্রধান প্রধান আন্দোলন-সংগ্রামের সভা-সমাবেশে ছিল এই কল-রেডী মাইক কোম্পানি। কেবল দেশ ও জনগণের স্বার্থে বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশে বাকিতেও সেবা দিয়েছে কল-রেডী। বিশেষ করে স্বাধীনতাযুদ্ধে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে কলরেডী বিনা পয়সায় সেবা দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশীদার হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিধন্য কলরেডী মাইক সার্ভিস অযত্ন অবহেলায় পড়ে আছে, এটা ইতিহাসের দায় এবং প্রাপ্য ঐতিহাসিক মর্যাদা দেওয়ার দায়ও কি জাতির নয়?

 


এ জাতীয় আরো খবর