মঙ্গলবার, ১১ মে ২০২১, ২৮ বৈশাখ ১৪২৮

বিলুপ্তপ্রায় ঢেলা মাছকে আবার ফিরিয়ে আনা হচ্ছে খাবার টেবিলে

  • স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
  • ২০২১-০৪-৩০ ০০:৪৭:২৯
image

একসময় দেশের নদ-নদী, হাওর ও বিলে  প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত দেশি ঢেলা মাছ। জলবায়ু পরিবর্তন, অতি আহরণ ও জলাশয় কমে যাওয়ায় প্রজনন এবং বিচরণক্ষেত্র নষ্ট হয়ে প্রায় বিলুপ্তির পথে বিশেষ পুষ্টিগুণের মাছটি। প্রায় দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠা এ মাছ আবারও খাবার টেবিলে ফেরার আশা দেখাচ্ছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) স্বাদুপানি গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা। টানা দুই বছরের গবেষণায় কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো ঢেলা মাছের পোনা উৎপাদনে সফল হয়েছেন তারা।

গবেষক দলে ছিলেন বিএফআরআইয়ের স্বাদুপানি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এইচ এম কোহিনুর, প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শাহা আলী, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সেলিনা ইয়াসমিন ও বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রবিউল আওয়াল। ইনস্টিটিউট থেকে জানানো হয়, ঢেলা মাছের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম হচ্ছে মে থেকে জুন। তবে প্রজননকাল শুরু হয় এপ্রিলের শেষ দিকে। এ মাছের ডিম ধারণক্ষমতা প্রতি গ্রামে ৭০০-৮০০টি।

গবেষকরা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ১০ জোড়া ঢেলা মাছে হরমোন প্রয়োগ করেন। হরমোন দেয়ার ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা পর মাছগুলো ডিম ছাড়ে। ডিম নিষিক্তের পরিমাণ ছিল প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ। ২২ ঘণ্টা পর সেই ডিম থেকে রেণু উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত এসব পোনা ইনস্টিটিউটের স্বাদুপানি কেন্দ্রের হ্যাচারিতে প্রতিপালন করা হচ্ছে। ঢেলা মাছ বিএফআরআই থেকে জানা যায়, অন্যান্য দেশি মাছের তুলনায় ঢেলা মাছে প্রচুর খনিজ পদার্থ আছে।

প্রতি ১০০ গ্রাম ঢেলা মাছে থাকে ভিটামিন এ ৯৩৭ আইইউ (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিট), ক্যালসিয়াম ১২৬০ মিলিগ্রাম এবং জিংক ১৩.৬০ শতাংশ, যা অন্যান্য দেশি মাছের তুলনায় অনেক বেশি। ভিটামিন এ শিশুদের রাতকানা রোগ থেকে রক্ষা করে। ক্যালসিয়াম হাড় গঠনে সহায়তা করে। এ ছাড়া জিংক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি করে।

গবেষক দলের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শাহা আলী জানান, ময়মনসিংহের পুরোনো ব্রহ্মপুত্র নদসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এসব ঢেলা মাছের পোনা সংগ্রহ করা হয়। কেন্দ্রের হ্যাচারিতে রেখে সেগুলোকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। তিনি আরও জানান, বছরব্যাপী জিএসআই ও হিস্টোলজি পরীক্ষার মাধ্যমে বের করা হয় ঢেলা মাছের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম। এরপর কৃত্রিম প্রজননের জন্য হরমোন ইনজেকশন দিয়ে সাওয়ারে রাখা হয় ১০ জোড়া মাছকে। সেখানেই ডিম দেওয়ার পর তা থেকে রেণু উৎপাদিত হয়।

ড. শাহা জানান, গবেষণায় দেখা গেছে, স্ত্রী ঢেলা মাছের ওজন ৬-৮ গ্রাম হলেই প্রজনন উপযোগী হয়। প্রজনন উপযোগী পুরুষ ঢেলা আকারে অপেক্ষকৃত ছোট (৪-৫ গ্রাম) হয়। প্রকৃতিতে স্ত্রী ঢেলার চেয়ে পুরুষ ঢেলার পরিমাণ বেশ কম। স্ত্রী ও পুরুষ ঢেলা প্রাপ্তির অনুপাত হচ্ছে ৪:১। বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদের আওতায় আনার বিষয়ে তিনি বলেন, চাষাবাদের আওতায় আনতে প্রচুর পোনা প্রয়োজন। তাই আমরা পোনা উৎপাদনসহ আরও দুই বছর গবেষণা করব। যাতে বাণিজ্যিকভাবে এ মাছচাষিরা সফলতা লাভ করেন। আগামী দুই বছরের মধ্যে ঢেলা মাছকে সম্পূর্ণভাবে চাষযোগ্য করতে পারবেন বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিএফআরআইয়ের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ এক প্রশ্নের জবাবে  জানান, বিপন্ন প্রজাতির দেশি সব মাছকে খাবার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ইনস্টিটিউটে সম্প্রতি ছোট মাছের গবেষণা বাড়ানো হয়েছে। এসব মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ময়মনসিংহে বিএফআরআইয়ের স্বাদুপানি কেন্দ্রে ২০২০ সালে একটি 'লাইভ জিন ব্যাংক' প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হওয়ায় ঢেলা মাছ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি চাষের মাধ্যমে এর উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। দেশীয় মাছ সংরক্ষণসহ গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বিএফআরআই ২০২০ সালে একুশে পদক পেয়েছে জানিয়ে মহাপরিচালক জানান, ইনস্টিটিউটটি এখন পর্যন্ত পাবদা, গুলশা, টেংরা, বৈরালীসহ ২৪টি দেশীয় ও বিলুপ্তপ্রায় মিঠাপানির মাছের প্রজনন ও চাষাবাদকৌশল উদ্ভাবন করেছে। বর্তমানে পিয়ালী, কাজলী, বাতাসি, কাকিলা, রাণী ও গাং টেংরাসহ ১০টি মাছ নিয়ে গবেষণা চালানো হচ্ছে।


এ জাতীয় আরো খবর