মঙ্গলবার, ১১ মে ২০২১, ২৮ বৈশাখ ১৪২৮

শিক্ষা ক্যাডারের অনলাইন সংলাপ-১: শিক্ষা ক্যাডারকে পিছিয়ে রাখা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চক্রান্তের অংশ

  • শিক্ষা ক্যাডার প্রতিনিধি
  • ২০২১-০৪-২৪ ০০:৩৫:৩২
image
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্যাডার হচ্ছে শিক্ষা ক্যাডার। প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার মেধাবী কর্মকর্তার সম্মিলন এই ক্যাডারে। শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিতে হলে আবশ্যিকভাবে সবার মাস্টার্স ডিগ্রি থাকতে হবে। প্রফেশনাল ক্যাডার ব্যতীত অন্যান্য সাধারণ ক্যাডারে পাস কোর্সে ডিগ্রী পাস করেও বিসিএস দিয়ে যোগ্যতা বলে ক্যাডার কর্মকর্তা হওয়া যায়। কিন্তু সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে মাস্টার্স পাশ হওয়া বাধ্যতামূলক। এত যোগ্যতা সম্পন্ন একটি ক্যাডারকে নানা ষড়যন্ত্র করে পিছিয়ে রাখা হয়েছে। এই ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে নবীন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য একটি নিরাপদ এবং সম্মানজনক ক্যাডার প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করতে হবে।

গত ২১ এপ্রিল ২০২১ খ্রি. বুধবার বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির আয়োজনে ধারাবাহিক অনলাইন সংলাপ-১ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সংলাপ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সদস্য সচিব প্রফেসর মো. শাহেদুল খবির চৌধুরী। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন জনাব সৈয়দ মইনুল হাসান, উপ-পরিচালক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর। অনলাইন ধারাবাহিক সংলাপে সারা বাংলাদেশ থেকে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন ব্যাচের প্রতিনিধিবৃন্দ, সমিতির আহবায়ক কমিটির নেতৃবৃন্দ এবং শিক্ষা ক্যাডারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

সভার শুরুতে সঞ্চালক জনাব সৈয়দ মইনুল হাসান পরিচিতি পর্বের মধ্য দিয়ে ধারাবাহিক সংলাপের মূল আলোচনা শুরু করেন। সূচনা বক্তব্যে তিনি বলেন, শিক্ষা ক্যাডারের নানান সংকট পূর্ব থেকেই ছিল। কিছু সমস্যা নতুনভাবে আরোপিত হয়েছে। এই সংকট এবং সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় বের করার জন্যই আমাদের এই ধারাবাহিক অনলাইন সংলাপ পর্ব।

স্বাগত বক্তব্যে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সদস্য সচিব প্রফেসর মো. শাহেদুল খবির চৌধুরী বলেন, শিক্ষা ক্যাডারের বিরাজমান সমস্যা ও তার সমাধানের জন্য পর্যায়ক্রমে আলোচনার অংশ হিসেবেই আজকের এই আয়োজন। সভায় উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আলোচনার মূল বিষয়কে কেন্দ্র করে বক্তব্য রাখার আহ্বান জানান। একই সাথে শিক্ষা ক্যাডারের সকল সমস্যা সমাধানে সবসময় সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার শপথ ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে তরুণদেরকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামনে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। শিক্ষা ক্যাডারের বর্তমান সমস্যার নেপথ্যে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে চিহ্নিত করেন।

বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি না দেওয়াকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু ব্যক্তির ষড়যন্ত্রের অংশ বলে তিনি মনে করেন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন যে, ‘সকল ক্যাডারের রিক্রুটমেন্ট রুলস একই হওয়া সত্ত্বেও ১৯৮২ সালের পর হতে অন্যান্য ক্যাডার বিকাশ লাভ করলেও শিক্ষা ক্যাডার বিকাশ লাভ করতে পারেনি। কেননা একটি অংশ সব সময় দেশকে পিছিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে শিক্ষা খাতকে পিছিয়ে রাখতে চেয়েছে।

 

তিনি আরো বলেন, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বিভাজিত করাও এই চক্রান্তের একটি অংশ। একই চক্রান্তের অংশ হিসেবে ২০০৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে অন্য ক্যাডার কর্মকর্তার পদায়ন।’

তিনি আজকের এই ধারাবাহিক সংলাপ আয়োজনের উদ্দেশ্য নিয়ে বলেন, ‘আলোচনার একটি মূল উদ্দেশ্য থাকবে বর্তমান সরকারকে সহায়তা করা এবং শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে সরকারকে অবহিত করা।’

  এই সংগঠনকে (বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতি) শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের জন্য একটি পরিবর্তিত সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ও তিনি ব্যক্ত করেন।

 

সদস্য সচিব প্রফেসর মো. শাহেদুল খবির চৌধুরীর বক্তব্য শেষে সঞ্চালকের আহ্বানে শিক্ষা ক্যাডারের সবচেয়ে নবীন, ৩৮ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা জনাব হারুনুর রশিদ অনলাইন সংলাপে অংশগ্রহণ করেন। তিনি নবীন প্রবীণ কর্মকর্তাদের নিয়ে এরকম একটি আয়োজনের জন্য বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান। দাবি হিসেবে অন্যান্য ক্যাডারের ন্যায় যোগদানের পরপরই বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং আইসিটি ক্যাডারের জন্য নতুন পদ সৃজনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।

  এরপর পর্যায়ক্রমে ৩৭ তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রতিনিধি জনাব জ্যাক পারভেজ রোজারিও, ৩৬ তম ব্যাচের প্রতিনিধি জনাব হাবিবুর রহমান হাবিব, ৩৫ তম ব্যাচের প্রতিনিধি জনাব মোঃ নাসির উদ্দিন মিয়া, ৩৪ তম ব্যাচের প্রতিনিধি জনাব সফিউল্লাহ সরকার দিদার, জনাব তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী, ৩৩ তম ব্যাচের প্রতিনিধি জনাব শাহিনুর রহমান, ৩২তম ব্যাচের প্রতিনিধি, ৩০তম ব্যাচের প্রতিনিধি জনাব মোঃ তরিকুল ইসলাম, জনাব কাওসার আহমেদ, ২৯ তম ব্যাচের প্রতিনিধি জনাব কায়েস হোসেন, ২৮ তম ব্যাচের প্রতিনিধি জনাব সিদ্দিকুর রহমান, ২৭ তম ব্যাচের প্রতিনিধি জনাব দাউদ হোসেন রাজা, ২৫ তম ব্যাচের প্রতিনিধি জনাব আব্দুল কাদের, ২৪ তম ব্যাচের প্রতিনিধি জনাব সৈয়দ মুস্তাফিজুর রহমান লিখন, জনাব এস এম সাইফুল ইসলাম, ২২ তম ব্যাচের প্রতিনিধি জনাব মোঃ আশরাফ উদ্দৌলা, ১৮ ব্যাচের প্রতিনিধি জনাব এস এম এমদাদুল কবির, জনাব মোঃ মনির হোসেন, জনাব মোঃ কামাল উদ্দিন, ১৭ তম ব্যাচ থেকে জনাব মোঃ আক্তারুজ্জামান ভূঁইয়া, ১৬ তম ব্যাচ থেকে প্রফেসর ড. শাহ মো. আমির আলী, ড. লোকমান ভূঁইয়া, জনাব মোঃ হোসাইন প্রমুখ অনলাইন সংলাপে অংশগ্রহণ করেন এবং শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন সমস্যা এবং এগুলোর সমাধানের উপায় নিয়েও আলোকপাত করেন। আলোচক ব্যতীত আরো প্রায় অর্ধ শতাধিক কর্মকর্তা উক্ত আলোচনা শ্রবণ করেন।

প্রতিনিধিদের সবার বক্তব্য শেষে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির নেতৃবৃন্দ পর্যায়ক্রমে তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন। সমিতির সাবেক দপ্তর সম্পাদক এবং বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জনাব সৈয়দ মইনুল হাসান বলেন, আমরা প্রমোশন এবং ক্যাডারের ন্যায্য পাওনা আদায়ে মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী হয়ে আর থাকবো না। আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা নিয়ে আমরা সামনে মুভ করবো। প্রয়োজনে সকল ব্যাচকে নিয়ে আমরা অবস্থান কর্মসূচি হাতে নিতে পারি। এছাড়াও নতুন তিনটি ব্যাচকে ভোটার করার প্রক্রিয়াও শীঘ্রই শুরু করা হবে বলে তিনি জানান। ঈদের পরে সবার সাথে আলোচনা করে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরুর কথাও তিনি বক্তব্যে বলেন। সমিতির সাবেক সহ-সভাপতি এবং বর্তমান আহ্বায়ক কমিটির সদস্য জনাব মাসুদা বেগম অধ্যাপক পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি সমস্যার সমাধান এবং শিক্ষাবিদ ইনস্টিটিউট স্থাপন বিষয়ে আলোকপাত করেন।

দীর্ঘ প্রায় ৫ ঘন্টা ব্যাপী অনলাইন সংলাপটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে চলমান ছিল। সবার বক্তব্য শেষে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আলোচনা সভার মূল আলোচ্য বিষয়গুলো ধরে ধরে আলোচনা করেন। শুরুতে তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। একটি জাতি গঠনের মৌলিক উপাদান এবং শক্তি হিসেবে বঙ্গবন্ধু শিক্ষাকে সকল কিছুর উপরে রাখতে চেয়েছেন এবং এ খাতের সঠিক বিকাশ না হলে একটি জাতি অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে বাধ্য বলে তিনি মনে করেন। শিক্ষা ক্যাডার বিগত দুই বছরে বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়েছে এবং তার প্রায় সব কটিতেই মন্ত্রণালয়ের ধীরগতি, সদিচ্ছা এবং আন্তরিকতার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন। তবে তিনি দৃঢ় কন্ঠে ব্যক্ত করেন, শিক্ষা ক্যাডারের বিরুদ্ধে এই যে চক্রান্ত চলছে, তা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে এসকল সমস্যা থেকে ক্যাডারকে অচিরেই মুক্ত করবেন। পদোন্নতি সহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করা, কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর জবাব প্রদান, শিক্ষা ক্যাডারের দাবি আদায়ে জনমত সংগঠন, প্রিন্ট মিডিয়াতে প্রচার, ক্যাডার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা যুক্ত করেন তিনি।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির আয়োজনে এই ধারাবাহিক সংলাপে শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন ব্যাচের প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যাচ প্রতিনিধি, সমিতির কর্মকর্তা, শিক্ষা ক্যাডারের সিনিয়র কর্মকর্তা সহ শতাধিক ক্যাডার কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেছিলেন। সমিতি সূত্রে জানা গেছে শিক্ষা ক্যাডারের ‘বিদ্যমান সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় এবং ভবিষ্যৎ ভাবনা’ শীর্ষক এই ধারাবাহিক সংলাপ পর্যায়ক্রমে চলবে। সবার মতামত নিয়ে, সবাইকে সম্পৃক্ত করে সমিতির ব্যানারে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।


এ জাতীয় আরো খবর