মঙ্গলবার, ১১ মে ২০২১, ২৮ বৈশাখ ১৪২৮

স্থায়ী সিভিল সার্ভিস সংস্কার কমিশন গঠনে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রস্তাব

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২০২১-০২-১৫ ১৭:৫২:১৯
image

দুর্নীতি প্রতিরোধে দক্ষ ও শুদ্ধাচারভিত্তিক জনপ্রশাসন গঠন করা জরুরি। জনগণের হয়রানি, ভোগান্তিমুক্ত উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক জনপ্রশাসনের বিকল্প নেই। তাই ভিন্ন আদলে জনমুখী জনপ্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে স্থায়ীভিত্তিক সিভিল সার্ভিস সংস্কার কমিশন চায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের কাছে পেশ করা দুদকের ২০১৯ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে স্থায়ী সিভিল সার্ভিস সংস্কার কমিশন গঠনের এই প্রস্তাব করেছে দুদক। ওইদিন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতিবেদন পেশ করে। এতে সেবাধর্মী ১৩টি খাতের দুর্নীতির উৎস ও দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হয়েছে। দুদক বলেছে, জনকল্যাণমুখী সিভিল সার্ভিস কমিশন গড়ে তুলতে মাঝেমধ্যে প্রচলিত সিভিল সার্ভিস কমিশনের সংস্কার প্রয়োজন। প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কঠিন নিয়মকানুন ও অপ্রয়োজনীয় জটিলতার কারণে অসন্তুষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষ সেবা পেতে সহজ-সরল পদ্ধতি প্রত্যাশা করেন। তারা চান, দীর্ঘসূত্রতা ও সেবা প্রাপ্তির চেয়ে নিয়মকানুন প্রতিপালনে গুরুত্ব দেওয়ার প্রচলিত ব্যবস্থার পরিবর্তে সহজ ও হয়রানি, দুর্নীতিমুক্ত বিধি ও নীতিমালা। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস কমিশন (বিসিএস) গঠন হয়। তবে এই সার্ভিসের প্রায় ১৫০ বছরের ইতিহাস রয়েছে।

প্রস্তাবিত সিভিল সার্ভিস সংস্কার কমিশনের যৌক্তিকতা: দুদকের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, নীতি প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিমাত্রায় কেন্দ্রিকতা ও অযৌক্তিক পদ-সোপানের পরিবর্তে ক্ষমতা ও দায়িত্ব ক্রমাগতভাবে বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা থেকেও সিভিল সার্ভিস সংস্কারে উদ্যোগ নেওয়া হয়। জনসাধারণের বৃহত্তর কল্যাণে আর্থসামাজিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণমূলক নিয়মকানুনের বেড়াজাল থেকে মুক্ত করতে সিভিল সার্ভিস সংস্কার করা দরকার। মেধাভিত্তিক মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, দক্ষ কর্মী নিয়োগ ও সিভিল সার্ভিসের সদস্যদের মেধা বিকাশে প্রায়োগিক পদ্ধতি প্রবর্তন, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল চাহিদা পূরণ করে সিভিল সার্ভিসের মানোন্নয়ন ও জনপ্রশাসনে উৎকর্ষ সাধন, সংসদীয় তদারকি ও প্রশাসনিক শুদ্ধাচারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা, দর্শনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতায় সিভিল সার্ভিস সংস্কার কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

প্রস্তাবিত কমিশনের বিশেষ কাজ: বিনিয়োগ আকর্ষণ, উন্নয়নে গতি আনতে স্বচ্ছতা, দক্ষতা, জবাবদিহিতা, কার্যকারিতা বাড়িয়ে দাপ্তরিক কর্মপদ্ধতি নতুন করে নির্ধারণ, জনসেবার মানোন্নয়ন, প্রশাসনে গতিশীলতা আনয়ন, ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতি উদার করা। স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণ, দুর্নীতি রোধ, সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে অসমতা ও আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করা; নির্বাহী বিভাগের ওপর সংসদীয় তদারকি বৃদ্ধিকরণ, সংবিধানের মূলনীতি ও সংশ্নিষ্ট আইনের আলোকে নজরদারি কাজের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এই কমিশনের কাজ হতে পারে বলে বলা হয় এ প্রতিবেদনে।

প্রস্তাবিত কমিশনের কার্যপরিধি: প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, সমতা বৃদ্ধি, পেশাগত পরিকল্পনা, বিশেষায়িত জ্ঞান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, সমতা ও অন্তর্ভুক্তিসহ সিভিল সার্ভিসের মৌলিক বিষয়ে সরকারকে নীতিগত পরামর্শ দেওয়া, প্রয়োজনবোধে নতুন আইন প্রণয়ন ও বিদ্যমান আইনি কাঠামো সংশোধন করতে সরকারকে পরামর্শ দেওয়া, সিভিল সার্ভিসের সামগ্রিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও যে কোনো ধরনের অনৈতিক প্রবণতা দেখা গেলে বা বোধগম্য হলে তা রোধ করতে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা, নিয়মিত গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা, সিভিল সার্ভিস-সংক্রান্ত সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ শনাক্ত করে তা প্রতিকারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে পরামর্শ দেওয়া, সময়োপযোগী চাহিদা পর্যালোচনা করে সে অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত ও কার্যকরী সংস্কারের জন্য সুপারিশ, নাগরিককেন্দ্রিক জনপ্রশাসন বিনির্মাণে কীভাবে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একই প্রবাহে পরিচালিত করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ ও জনস্বার্থে সংসদ বা সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে নির্ধারিত অন্য যে কোনো কার্যক্রম সম্পাদন করা হতে পারে এই কমিশনের কার্যপরিধি।

কমিশনকে ক্ষমতা দিতে আইন: প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রস্তাবিত কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কার্যাবলির সম্পাদনের ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা দিতে হবে, কেবল জাতীয় সংসদ ও রাষ্ট্রপতির কাছে দায়বদ্ধতা, চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক পাঁচ বছর মেয়াদে নিয়োগ দেওয়া, তথ্য অধিকার আইন-২০০৯-এর বিধান সাপেক্ষে যে কোনো সরকারি বা বেসরকারি অফিস/সংস্থা পরিদর্শন ও যে কোনো ধরনের দলিলাদি, তথ্য বা রেকর্ড অবাধে পর্যালোচনা করার কর্তৃত্ব, কমিশন কর্তৃক সময়ে সময়ে প্রণীত সুপারিশমালা বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিবীক্ষণের ক্ষমতা, কমিশনের কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলে সরকার বা সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা চাওয়ার ক্ষমতা ও সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কার্যপরিধির আলোকে প্রয়োজনবোধে কমিশন স্থায়ী বেতন কমিশন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে পারে।

কমিশনের কার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রগুলো: বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের সব ক্যাডারের (বর্তমানে ২৬টি) কর্মপরিধির আওতায় কমিশন যেসব ক্ষেত্রে সংস্কারমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে সেগুলো হলো- জনপ্রশাসন, সুশাসন, অর্থনীতি ও উন্নয়ন, শিক্ষা ও সমাজসেবা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও উদ্ভাবন, যোগাযোগ, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, অর্থ, হিসাব ও নিরীক্ষা, আইন, জাতীয় নীতি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাষ্ট্রীয় ও জননিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন। প্রস্তাবিত কমিশনের সাংগঠনিক কাঠামো: প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পাঁচজন কমিশনারের সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হবে, রাষ্ট্রপতি একজন উপযুক্ত ব্যক্তিকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেবেন, কমিশনের পাঁচটি ইউনিটের আওতায় উল্লিখিত দশটি সেক্টর পরিচালনা করা যেতে পারে, একজন কমিশনার একটি ইউনিটের দায়িত্বে থাকবেন, প্রস্তাবিত স্থায়ী সিভিল সার্ভিস কমিশন আইনের মাধ্যমে এই মর্মে আইনি সুরক্ষা দেওয়া আবশ্যক যে, কেবল কোনো কমিশনারের পদে শূন্যতা বা কমিশন গঠনে ত্রুটি থাকার কারণে কমিশনের কোনো কার্যক্রম অবৈধ হবে না ও এই বিষয়ে কোনো আদালতে প্রশ্নও তোলা যাবে না। এ ছাড়া প্রতিটি কার্যনির্বাহী সেক্টরের জন্য একজন করে মোট দশজন মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে, কমিশনের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন পরিচালনার জন্য সরাসরি চেয়ারম্যানের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে একজন সচিব পদায়ন করা যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন: প্রতিবেদনে বলা হয়, সিভিল সার্ভিসের বিদ্যমান প্রেক্ষাপট ও সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনা করে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার কথা বিবেচনা করে সরকার একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করতে পারে। এই কমিটি একটি পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠনের লক্ষ্যে বিদ্যমান প্রশাসনিক, আইনি ও কার্যকরী কাঠামো পরিপূর্ণভাবে বিশ্নেষণ ও গবেষণা পরিচালনা করে বিস্তারিত সুপারিশসহ গবেষণা প্রতিবেদন সরকারের কাছে উপস্থাপন করবে। একটি স্বতন্ত্র সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্থায়ী সিভিল সার্ভিস সংস্কার কমিশন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদন প্রয়োজনবোধে সংসদে উত্থাপন করে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা করবে। সূত্র: সমকাল


এ জাতীয় আরো খবর