মঙ্গলবার, ১১ মে ২০২১, ২৮ বৈশাখ ১৪২৮

রাবি ভিসির ১৯৭৩ সালের অ্যাক্ট, স্ট্যাটিউটস ও অর্ডিন্যান্স লঙ্ঘন

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২০২১-০১-২৫ ১৪:০৮:৫৯
image

ড. মু. আলী আসগর 

অধ্যাপক,
ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

 

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক প্রধানকে বলা হয় ভাইস চ্যান্সেলর। কিন্তু এই পদটির মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হতে হতে এমন স্তরে পৌঁছেছে যে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্যের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ তদন্ত করার জন্য অভিযুক্ত ও অভিযোগকারী- উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনতে গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তদন্ত কমিটি উন্মুক্ত শুনানির ব্যবস্থা করে এবং উপাচার্যের অনিয়মের সত্যতা প্রমাণ পায়। ইউজিসির তদন্ত কমিটি সরকারকে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইউজিসির তদন্ত রিপোর্টের সত্যতা পেয়ে গত বছরের ১০ ও ১৩ ডিসেম্বর কিছু বিষয়ে নির্দেশনা দেয় ও কিছু বিষয়ে কৈফিয়ত তলব করে।

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রদত্ত ১৯৭৩ সালের অ্যাক্ট দ্বারা পরিচালিত। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, রাবি উপাচার্যের বাসভবনে তালা ঝোলানোর বিষয়টি স্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি ও এগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এপটেনশন বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারুক হাসান বলেন, '১৯৭৩-এর অ্যাক্ট অনুযায়ী চারটি বিশ্ববিদ্যালয় চলে, এর মাঝে রাবি একটি। কয়েকদিন আগে দেখেছি উপাচার্যের ওপর কিছু কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে একটি নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে। আমরা উপাচার্য স্যারের কাছে জানতে চেয়েছি, তারা এটি পারে কিনা?' তখন স্যার বলেছেন, 'এটা ৭৩-এর অ্যাক্টের লঙ্ঘন। এটা তাদের পার্সোনাল ইন্টারেস্টের জায়গা থেকে আমাকে ব্লক করছে।'

 

এক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, আওয়ামী লীগ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয় কি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ অ্যাক্ট সম্পর্কে অবগত নন এবং নিজদলীয় উপাচার্যকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোন পার্সোনাল ইন্টারেস্টের জায়গা থেকে ব্লক করছে? তা ছাড়া আদালতে ও ইউজিসিতে রাবি উপাচার্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে উপাচার্যের পক্ষ থেকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যালেন্ডারে বর্ণিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ অ্যাক্টের অধীন ৫১নং ধারার 'অ্যাপিলস টু চ্যান্সেলর'-এর রেফারেন্স দিয়ে বলা হয়, কেউ উপাচার্যের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হলে ৫১নং ধারায় মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর মহোদয়ের নিকট আপিল করা উচিত। কিন্তু আমি ১৯৭৩ অ্যাক্টের অধীন ৫১নং ধারা পড়ে আমার স্বল্প বুদ্ধিতে বুঝেছি, আদালত বা অন্য কোথাও অভিযোগ করার আগে মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর মহোদয়ের কাছে আপিল করা আবশ্যিক নয়। এটি একটি অপশন।

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ অ্যাক্টের অধীন ১২নং ধারার উপাচার্যের ক্ষমতা ও কর্তব্য ২নং উপধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা আছে, 'উপাচার্যের কর্তব্য ১৯৭৩ অ্যাক্ট, স্ট্যাটিউট ও অর্ডিন্যান্স যথাযথভাবে প্রতিপালন/মান্য করা। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর এম আব্দুস সোবহান নিল্ফেম্নাক্তভাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ অ্যাক্টের অধীন ১২নং ধারার (উপাচার্যের ক্ষমতা ও কর্তব্য) ২নং উপধারায় বর্ণিত কর্তব্য প্রতিপালন/মান্য করেন নাই।'

 

১. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩-এর মূল উদ্দেশ্য 'ইমপ্রুভিং দ্য টিচিং অ্যান্ড রিসার্চ' (তথ্যসূত্র :রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যালেন্ডার; চ্যাপ্টার ১)। শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নত করার পূর্বশর্ত হচ্ছে- বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক উন্নত মানের শিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করা। সেই লক্ষ্যে প্রায় আড়াই বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে ২০১৫ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটে 'শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা' অনুমোদিত হয়, যা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৫ নামে পরিচিত। কিন্তু ২০১৭ সালের ৭ মে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণের পর, একই বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৫ ব্যাপকভাবে শিথিল করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৭ প্রণয়ন করেন। ২০১৭ সালে শিথিলকৃত শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩-এর মূল উদ্দেশ্য 'ইমপ্রুভিং দ্য টিচিং অ্যান্ড রিসার্চ' থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বিচ্যুত হয়ে রাবির শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংসের পথ সুগম করা হয়েছে। সে কারণেই গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নীলিমা আফরোজ স্বাক্ষরিত পত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭ সালের নিয়োগ নীতিমালা বাতিল করে ১৯৭৩-এর আদেশ অনুযায়ী পরিচালিত অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় যেমন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিমালা প্রণয়নের জন্য নির্দেশক্রমে উপাচার্যকে অনুরোধ করা হয়েছে।

 

উপাচার্য অধ্যাপক এম আব্দুস সোবহানের মেয়ে সানজানা সোবহান বিজনেস স্টাডিজ অন্তর্ভুক্ত মার্কেটিং বিভাগ থেকে পাস করে ২২তম অবস্থানে থেকে শিক্ষক হয়েছেন এবং উপাচার্যের নিজ জামাতা এটিএম শাহেদ পারভেজ বিজনেস স্টাডিজ অন্তর্ভুক্ত মার্কেটিং বিভাগ থেকে সিজিপিএ তিন দশমিক চার সাত নয় পেয়ে ৬৭তম অবস্থানে থেকে শিক্ষক হয়েছেন। উল্লেখ্য যে, রাবির শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা-২০১৫ অনুযায়ী, বর্তমান উপাচার্যের মেয়ে ও নিজ জামাতার আবেদনের যোগ্যতা ছিল না। উপাচার্যের এমন স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের কারণে দেশের ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে এবং গবেষণার মানও নিম্নগামী করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ অবস্থায় উপাচার্যের মেয়ে-জামাতার নিয়োগ কেন বাতিল করা হবে না- ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নিলীমা আফরোজ স্বাক্ষরিত পত্রে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য নির্দেশক্রমে উপাচার্যকে অনুরোধ করা হয়েছে।

 

২. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৭৩-এর ২৯ ধারা 'দ্য ফার্স্ট স্ট্যাটিউটস অব দ্য ইউনিভার্সিটি'-এর ৩-এর ১ ধারায় বর্ণিত আছে, উপাচার্য জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে (অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর পদের নিচে নয়) পর্যায়ক্রমে তিন বছরের জন্য বিভাগের সভাপতি নিয়োগ দেবেন। কিন্তু গত ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার পর করোনা সংকটকালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তিনটি বিভাগে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বিভাগের সভাপতি নিয়োগ না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন লঙ্ঘন করেন। এ বিষয়টি ইউজিসির উন্মুক্ত শুনানিতে

এজেন্ডা ছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য তার প্রথম মেয়াদে একইভাবে এগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এপটেনশন বিভাগে এবং দ্বিতীয় মেয়াদে ২১ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে আইন ও ভূমি প্রশাসন বিভাগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৭৩-এর ২৯ ধারা 'দ্য ফার্স্ট স্ট্যাটিউটস অব দ্য ইউনিভার্সিটি'-এর ৩-এর ১ ধারা লঙ্ঘন করে সভাপতি নিয়োগ দিয়েছিলেন।

 

৩. রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ অ্যাক্টের চ্যাপ্টার ৫-এর ধারা ২(সি)/অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী, বিভাগের প্ল্যানিং কমিটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পদ সৃষ্টি, উক্ত পদ পূরণার্থে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সর্বোপরি সংশ্নিষ্ট শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ। অর্থাৎ স্ব-স্ব বিভাগের প্লানিং কমিটি কর্তৃক শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা নির্ধারণ ভিন্ন সিন্ডিকেটের শিক্ষক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সুযোগ নেই। আইন অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগের যোগ্যতা নির্ধারণ শুধু বিভাগের প্ল্যানিং কমিটির ওপর ন্যস্ত। একমাত্র বিভাগের প্ল্যানিং কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই সিন্ডিকেট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর এম আব্দুস সোবহান প্ল্যানিং কমিটির সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় ঘটিয়ে নিজেই তার প্রথম ও দ্বিতীয় মেয়াদে কয়েকটি বিভাগের শিক্ষকের যোগ্যতা নির্ধারণ করে, তা সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদন দেন। রাবির ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের তিন শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ে (হাইকোর্টের রিট পিটিশন নং ৮৯৮৬/২০১৯) আদালত বলেছেন, 'যিনি সুপারিশকারী তিনিই অনুমোদনকারী হতে পারে না।'


এ জাতীয় আরো খবর